আগের দিনও হালকা ঝড়বৃষ্টি ছিল। আজ নেই। তবে আকাশ ছেয়ে আছে ধূসর মেঘে। না রোদ, না বৃষ্টি—একটা গুমোট ভাব। মনে হচ্ছে বৃষ্টি হবে, কিন্তু হচ্ছে না।
সকালে হাঁটতে হাঁটতে ঢুকে পড়েছি রমনা পার্কে। হেঁটে কিছুটা এগিয়ে যেতেই এক নীলাঞ্জনা সুন্দরী আমাকে অন্ধ করে দিল। আহা, কী রূপ ক্ষীণ তন্বী তরুটির। ছিপছিপে বাহু চারদিকে প্রসারিত করে যেন পথিকদেরই আলিঙ্গনে উদ্যত। পুরাণের নারীদের মতো শাখাভরা তার পুষ্পালংকার। সে কি শকুন্তলা? কাছে এগিয়ে গেলাম। না, শকুন্তলা না, ওর নাম অঞ্জন।
কয়েক বছর আগেও অঞ্জনের দেখা পেয়েছিলাম এই রমনা পার্কেই। বসন্তের পর অল্প কিছু ফুল গায়ে জড়িয়ে ছিল বলে হয়তো তেমন আকর্ষণ বোধ করিনি। লেখারও কোনো তাগিদ হয়নি।
অঞ্জন আমাদের দেশি নয়, বিদেশিনী। তাই বলে সুদূর ইউরোপে নয়, গাছটির জন্ম ভারত বা মিয়ানমারে হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। এ দেশে সুলভ নয়, স্বল্প কয়েকটি উদ্যানে চোখে পড়ে। নীলাঞ্জনার নীল ফুলের আকর্ষণেই তাকে নিয়ে লিখতে হলো। কারণ, প্রকৃতির রাজ্যে অপরাজিতা ছাড়া নীল ফুল খুব একটা চোখে পড়ে না।
বলধা গার্ডেন আর সাভার স্মৃতিসৌধের প্রাঙ্গণেও অঞ্জনগাছের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। তার মানে গাছটি উদ্ভিদ-রসিকদের চোখে বেশ ভালোই ধরেছে। ১৯৯২ সালের ৪ অক্টোবর শ্রীলঙ্কার তত্কালীন প্রেসিডেন্ট রানাসিংহে প্রেমাদাসা সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধ প্রাঙ্গণে অঞ্জন ফুলগাছের একটি চারা লাগিয়েছিলেন।
গত মার্চে গিয়ে দেখতে পেলাম, সেই চারা তার ডালপালা ফুলে ফুলে ভরিয়ে তুলেছে। গাছটা বেশ বড়ও হয়ে উঠেছে। ছোটখাটো বৃক্ষই বলা যায়। মূল কাণ্ডের তুলনায় মাথার দিকে এতটাই ডালপালা ছড়িয়েছে যে দেখলে মনে হয় বিশাল এক ছাতা। কোন ডালে বা উপডালে যে ফুল নেই, সেটা খুঁজতে গিয়ে নাকাল হতে হলো।
এটি চিরসবুজ ছোট বৃক্ষ, কাণ্ড ও ডাল বেশ শক্ত। ফেব্রুয়ারি-মার্চে ফুল ফোটে। নীল বেগুনি ফুলগুলো খুবই ছোট। অসংখ্য ছোট ছোট ফুল একসঙ্গে একটি থোকায় ডালের গায়ে ফোটে। এভাবে ডালের গোড়া থেকে আগা পর্যন্ত ফুল ফোটে থোকায় থোকায়, বিশেষ করে সরু ডালগুলোতে। ফুলে ঘ্রাণ নেই, তবু উজ্জ্বল রঙের মায়ায় আবিষ্ট হয়ে মৌমাছিরা আসে। ফল খুব ছোট, বর্তুলাকার, মাত্র ৭ মিলিমিটার ব্যাস। রং নীলাভ-কালো। ফল খাওয়া যায়।
গাছের পাতার অগ্রভাগ সরু, মাঝখানটা বেশ চওড়া। ডালের দুই পাশে সারি করে থাকে পাতাগুলো। পাতা থেকে হলুদ রং তৈরি হয়। প্রাচীনকালে বৌদ্ধ ভিক্ষুরা তাদের কাপড় রং করতে এ গাছের পাতা ব্যবহার করতেন বলে জানা যায়। ডায়রিয়া, গনোরিয়া, লিউকোরিয়া, অনিয়মিত ঋতুর চিকিত্সায় এ গাছের বিভিন্ন অংশ ব্যবহার করা হয়। ঔষধি গাছ হিসেবে কাজে লাগে। সাধারণত বনজঙ্গলে জন্মায়। রোদ কিংবা আধো ছায়ায় চারা মাথা তোলে। সম্প্রতি কিছু কিছু উদ্যানে অঞ্জনগাছ লাগানো হচ্ছে শোভাবর্ধক গাছ হিসেবে। গুটি কলম করে এ গাছের চারা তৈরি করা যায়।
অন্যান্য উদ্যানেও গাছটি লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।