চরমপন্থী গোপন রাজনৈতিক দলে যোগ দিয়েছিলেন ইউনুছ আলী। হানাহানির কারণে পলাতক ছিলেন দীর্ঘদিন। জেলও খেটেছেন কয়েক বছর। স্বাভাবিক জীবনে ফিরে ইউনুছ এখন পুরোদস্তুর ফুলচাষি। ফুল চাষ করে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে শান্তিতে বসবাস করছেন এখন। ইউনুছ আলীর (৬৬) বাড়ি ঝিনাইদহ সদর উপজেলার গান্না ইউনিয়নের গান্না গ্রামে।
ইউনুছ আলী বলেন, ‘রাজনীতি’ ছেড়ে কিছুদিন চাকরি করেন। ২০০০ সালে ফুল চাষ শুরু করেন। এখন নিজে করতে না পারলেও দেখাশোনা করেন। শ্রমিক দিয়ে কাজ করান। বর্তমানে অনেক ভালো আছেন। এখন আর পলাতক জীবন নেই। ফুলের সুবাস পাল্টে দিয়েছে তাঁদের।
গান্না ইউনিয়নের ইকড়া গ্রামের ওলিয়ার রহমান ১৯৯৬ সালে চরমপন্থা ছেড়ে চাষাবাদ শুরু করেন। বর্তমানে ফুলের চাষাবাদের পাশাপাশি ২০১১ সাল থেকে ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘সমাজ পরিবর্তনের যে আশা নিয়ে রাজনীতিতে যোগ দিয়েছিলাম, তার কিছুই হয়নি। উল্টো হানাহানি হয়েছে।’ এখন তাঁদের এলাকা অনেক ভালো। সবাই খুব পরিশ্রমী। ফুল চাষ তাঁদের জীবনযাত্রার মান পাল্টে দিয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা, জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উপজেলার গান্না ইউনিয়নে প্রায় ২৬ হাজার মানুষের বসবাস। বেশির ভাগ মানুষ কৃষিজীবী।
গান্না ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সাবেক চেয়ারম্যান নাসির উদ্দিন মালিতা প্রথম আলোকে বলেন, চরমপন্থীদের অনেকে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করতে সাধারণ মানুষের ওপর চড়াও হন। তখন হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা ঘটে। একসময় চরমপন্থী ছিলেন এমন অন্তত ১৫–২০ জন স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এখন ফুল চাষের সঙ্গে যুক্ত।
বর্তমান ইউপি চেয়ারম্যান আতিকুল ইসলাম বলেন, একসময়ের চরমপন্থী এলাকার বাসিন্দারা আজ কৃষিকাজে ঝুঁকে পড়েছেন। তাঁরা ফুল-ফলের চাষ করছেন। এখন ফুলে-ফলে ভরে গেছে গোটা এলাকা, যা সম্ভব হয়েছে কৃষকদের অক্লান্ত প্রচেষ্টায়।
১৯৯৫ সালে গান্নায় চরমপন্থীদের দাপট যখন তুঙ্গে, তখন গান্না বাজার-সংলগ্ন পাইকপাড়া গ্রামে প্রথম গাঁদা ফুলের চাষ করেন কৃষক বাকী বিল্লাহ। এক বছর পর গান্না গ্রামের খোদা বক্স ফুল চাষ শুরু করেন। এভাবে দু-চারজন ফুল চাষ শুরু করলেও তেমন বিস্তার হয়নি। ফুলের বাজার না থাকায় কৃষকেরা দূরে নিয়ে ফুল বিক্রি করতেন। ২০০০ সালের পর এলাকার অবস্থা ভালো হওয়া শুরু করলে ফুল চাষের বিস্তার বাড়তে থাকে।
কৃষক খোদা বক্স জানান, বর্তমানে মাঠের পর মাঠ ফুল চাষ হচ্ছে। এলাকার মানুষ আতঙ্কে থাকে না। সবাই মুক্তমনে ফুল-ফলের চাষ করছেন।
কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, ঝিনাইদহে ১৪৩ হেক্টর জমিতে ফুলের আবাদ হয়। এর মধ্যে সদর উপজেলার ১৭টি ইউনিয়নে চাষ হয়েছে ৬০ হেক্টর জমিতে। আর গান্না ইউনিয়নেই চাষ হয়েছে ৫০ হেক্টর জমি। বেশির ভাগই গাঁদা ফুল। কিছু জমিতে রজনীগন্ধা, জারবেরা, লিলিয়াম, গোলাপসহ অন্যান্য ফুল আছে। এলাকার দুই হাজারের বেশি মানুষ ফুল চাষের সঙ্গে জড়িত।
সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. জাহিদুল করিম বলেন, গান্না এলাকায় প্রচুর ফুল চাষ হচ্ছে। ফুলচাষিদের বাজার অবকাঠামো, সংরক্ষণ ও পরিবহনের সুবিধার্থে কাজ করে যাচ্ছে কৃষি বিপণন অধিদপ্তর। চাষাবাদ বাড়াতে তারা সব ধরনের সহযোগিতা করে যাচ্ছে।
গান্না বাজার ফুলচাষি ও ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম বলেন, গান্না ফুলের বাজারে প্রতিদিন ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকার ফুল বিক্রি হয়।
গান্না এলাকার কৃষক আবদুর রহিমের পাঁচ ছেলে। সবাই ফুল চাষ করেন। চরমপন্থী রাজনীতি ছেড়ে ফুলের চাষাবাদ শুরু করেছিলেন আবদুর রহিম। তাঁর মৃত্যুর পর সন্তানেরা চাষাবাদ অব্যাহত রেখেছেন।
আবদুর রহিমের ছেলে আক্তারুল ইসলাম বলেন, বাবা চরমপন্থী দলে ভিড়েছিলেন। এটা তাঁদের জন্য কষ্টকর ছিল। পরে বাবা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে ফুল চাষ শুরু করেন। এখন তাঁর মৃত্যুর পর তাঁরা ভাইয়েরা ফুল চাষ ধরে রেখেছেন। এখন তাঁদের সংসারে সচ্ছলতা ফিরেছে।