১৭ মার্চ, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর
রহমানের ১০৩তম জন্মবার্ষিকী। দিনটি রাষ্ট্রীয়ভাবে জাতীয় শিশু দিবস হিসেবে
পালন করে থাকে সরকার।
১৯২০ সালের এই দিনে (১৭ মার্চ) তদানীন্তন
ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জ মহকুমার টুঙ্গিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন শেখ মুজিবুর
রহমান। বাবার নাম শেখ লুৎফর রহমান, আর মা সায়েরা খাতুন। চার বোন ও দুই
ভাইয়ের মধ্যে শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন তৃতীয়। পরবর্তীতে ‘খোকা’ নামের এই
শিশুটিই হয়ে ওঠেন নির্যাতিত-নিপীড়িত বাঙালির ত্রাতা ও মুক্তির দিশারি।
শেখ মুজিবুর রহমান গ্রামীণ সমাজের সুখ-দুঃখ,
হাসি-কান্না, আবেগ-অনুভূতি শিশুকাল থেকে প্রত্যক্ষ করেছেন। গ্রামের মাটি
আর মানুষ তাকে প্রবলভাবে আকর্ষণ করতো। শৈশব থেকে তৎকালীন সমাজ জীবনে তিনি
জমিদার, তালুকদার ও মহাজনদের অত্যাচার, শোষণ ও প্রজাপীড়ন দেখে চরমভাবে
ব্যথিত হতেন। গ্রামের হিন্দু-মুসলমানদের সম্মিলিত সম্প্রীতির সামাজিক আবহে
তিনি দীক্ষা পান অসাম্প্রদায়িক চেতনার। কিশোর বয়সেই রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে
অংশগ্রহণ করেন।
গোপালগঞ্জের মিশন স্কুলে অষ্টম শ্রেণিতে
অধ্যয়নকালে, তৎকালীন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে যোগ দিয়ে প্রথমবারের মতো
গ্রেফতার হয়ে কারাবরণ করেন শেখ মুজিবুর রহমান। এরপর থেকে শুরু হয় তার
সংগ্রামী জীবনের অভিযাত্রা।
বঙ্গবন্ধু সারাজীবন এদেশের মাটি ও মানুষের
অধিকার আদায়ে সংগ্রাম করেছেন। বাঙালি জাতির মুক্তির জন্য জীবনের ১৪ বছর
পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি থেকেছেন। দুইবার ফাঁসির মঞ্চে হয়েছেন মৃত্যুর
মুখোমুখি। কিন্তু আত্মমর্যাদা ও বাঙালি জাতির অধিকারের প্রশ্নে কখনো মাথা
নত করেননি।
দীর্ঘ ২৩ বছরের আন্দোলন-সংগ্রামের
পথপরিক্রমায় বঙ্গবন্ধু তার সহকর্মীদের নিয়ে ১৯৪৮ সালে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ
এবং পরবর্তীতে ১৯৪৯ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ গঠন করেন। ১৯৫২-এর ভাষা
আন্দোলন, ’৫৪- এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ’৬২- এর শিক্ষা আন্দোলন, ’৬৬- এর
ছয় দফা আন্দোলন, ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান পেরিয়ে ’৭০ সালের ঐতিহাসিক নির্বাচনে
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে
প্রতিষ্ঠিত হন।
বঙ্গবন্ধুর সাহসী ও আপোষহীন নেতৃত্বে
অনুপ্রাণিত হয়ে জেগে ওঠে নির্যাতিত-নিপীড়িত পরাধীন বাঙালি জাতি। ১৯৭১ সালের
৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। যেখানে
তিনি ঘোষণা করেন- ‘এবারের সংগ্রাম, আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের
সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম।’
বঙ্গবন্ধুর এই ঘোষণার পর দেশজুড়ে শুরু হয়
সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে পাকিস্তানি
হানাদার বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হওয়ার আগে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের
স্বাধীনতা ঘোষণা করেন বঙ্গবন্ধু।
এরপর নয় মাস রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র যুদ্ধের মধ্য
দিয়ে ৩০ লাখ শহীদের আত্মদান ও দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমহানির বিনিময়ে
অর্জিত হয় স্বাধীনতা। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বিশ্বমানচিত্রে অভ্যুদয় ঘটে
স্বাধীন বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের। বাংলা-বাঙালি-বঙ্গবন্ধু এবং বাংলাদেশ এক ও
অবিচ্ছেদ্য অংশ। শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা।
বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও ১৯৭৫ সালে এ জাতির
ভাগ্যে নেমে আসে আরেকটি কালরাত্রিতে। ওই বছরের ১৫ আগস্ট বিশ্বাসঘাতকদের
নির্মম বুলেটে সপরিবারে নিহত হন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এরপর
অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারী স্বাধীন বাংলাদেশে পাকিস্তানি ভাবধারার মূল্যবোধের
বিস্তার ঘটানোর পাঁয়তারা চালায়। ইতিহাসের পাতা থেকে বঙ্গবন্ধুর নাম মুছে
ফেলতে শুরু করে নানা ষড়যন্ত্র। কিন্তু তার সংগ্রাম ও গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকার
জন্য তা মুছে ফেলতে পারেনি। বাংলা ও বাঙালি যতদিন থাকবে, বঙ্গবন্ধু একইভাবে
প্রজ্বলিত হবেন প্রতিটি বাঙালি হৃদয়ে, মুক্তিকামী ও শান্তিকামীর হৃদয়ে।
তাইতো কবি লিখেছেন-
‘যতকাল রবে পদ্মা, মেঘনা
গৌরী, যমুনা বহমান
ততকাল রবে কীর্তি তোমার
শেখ মুজিবুর রহমান।’
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের
জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে ঘোষিত ‘মুজিববর্ষ’ বাঙালি জাতির ইতিহাসে এক অনন্য
মাইলফলক ও অভাবনীয় ঘটনা। এরই মধ্যে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে আওয়ামী লীগ এ দিবসে
নানা কর্মসূচির আয়োজন করেছে।
নগরে যত আয়োজন
বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন ও জাতীয় শিশু দিবস উপলক্ষে নগরে বিভিন্ন সংগঠনের
উদ্যোগে কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে। মহানগর আওয়ামী লীগের উদ্যোগে সকাল ৯টায়
থিয়েটার ইনস্টিটিউট হলে খতমে কোরআন, দোয়া ও মিলাদ মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়।
সকাল ১০টায় আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। এতে সভাপতিত্ব করছেন মহানগর
আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মাহতাব উদ্দীন চৌধুরী। এছাড়া সকালে দারুল
ফজল মার্কেটস্থ দলীয় কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন, বঙ্গবন্ধুর
প্রতিকৃতিতে মাল্যদান করা হয়।
সকালে জেলা প্রশাসনের আয়োজনে শিল্পকলা একাডেমিতে বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন ও জাতীয় শিশু দিবস উপলক্ষে শ্রদ্ধা নিবেদন এবং কেক কাটা হয়।
চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে- জাতীয় ও
দলীয় পতাকা উত্তোলন, জাতির জনকের প্রতিকৃতিতে পুষ্পমাল্য অর্পণ ও বিকাল
৪টায় চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব বঙ্গবন্ধু হলে আলোচনা সভা। প্রধান অতিথি
থাকবেন আওয়ামীলীগ সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার
মোশাররফ হোসেন এমপি। সভায় সকলকে উপস্থিত থাকার জন্য চট্টগ্রাম উত্তর জেলা
আওয়ামী লীগ সভাপতি এম এ সালাম ও সাধারণ সম্পাদক শেখ আতাউর রহমান অনুরোধ
জানিয়েছেন।
চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব ও চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়নের যৌথ উদ্যোগে সকাল ১১টায় জাতির জনকের প্রতিকৃতিতে পুষ্পমাল্য অর্পণ করা হবে।
চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের উদ্যোগে সকাল ১০টায়
শিল্পকলা একাডেমিতে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন, দুপুর ১২টায়
সার্কিট হাউস সংলগ্ন শিশু পার্কে শিশুদের নিয়ে বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন উদযাপন,
শিশুদের মাঝে জাতীয় পতাকা, শিক্ষা উপকরণ ও খাবার বিতরণের পাশাপাশি
শিশুদের জন্য ফ্রি রাইডের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
চট্টল ইয়ুথ কয়ার এর উদ্যোগে সকাল ১০টায় কুয়াইশ অক্সিজেন রোডের
মাথায় বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ,
আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠান, বিকাল ৩টায়
চট্টল ইয়ুথ কয়ারের প্রধান কেন্দ্র চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলে সাংস্কৃতিক
প্রতিযোগিতা ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে।
এদিকে জাতির জনকের ১০২তম জন্মবার্ষিকী ও জাতীয় শিশু দিবস উপলক্ষে
শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল এর নির্দেশনায় সকাল ১০টায় ১২
বছর থেকে ১৮ বছর বয়সী শিশুদের নিয়ে গণটিকার কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে।
কাউন্সিলর জহর লাল হাজারীর তত্ত্বাবধানে, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ও জেলা
সিভিল সার্জনের সহযোগিতায় জেল রোডস্থ ওয়ার্ড কার্যালয় অফিসে (আনসার
ক্লাব) এই টিকা কেন্দ্রে সপ্তাহে ৭ দিনই টিকাদান কার্যক্রম চলমান থাকবে।