চারপাশে বসতির চিহ্নমাত্র নেই। রয়েছে হাতেগোনা কয়েকটি মন্দির। সেগুলোর অদূরে গোলাপি আভা মাখানো জলের এক হ্রদের টানে দেখা যায় গুটিকয়েক উৎসাহীকে। ভারতের বুলঢাণা জেলায় এটি অবস্থিত।
বুলঢাণায় প্রায় ৬ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে রয়েছে লোনার হ্রদ। হাজার হাজার বছর আগে প্রবল গতিতে ছুটে আসা এক উল্কাপাতের জেরেই নাকি সেখানে বিশাল আকারের গর্ত হয়ে গিয়েছিল। যা ধীরে ধীরে হ্রদে পরিণত হয়।
বৈজ্ঞানিকদের দাবি, লোনার হ্রদে একই সঙ্গে বয়ে চলেছে মিষ্টি এবং নোনতা
পানি। তাতে রয়েছে ক্ষারীয় স্বাদের পানিও। তা সত্ত্বেও ভিন্ন স্বাদের পানিতে
মিলেমিশে বইছে না লোনার হ্রদে। কেনো এমন হচ্ছে, তা নিয়ে রহস্য দানা
বেঁধেছে। লোনার হ্রদের দক্ষিণ দিকের পানি বেশ মিষ্টি। আবার অন্যান্য দিকের পানির স্বাদ নোনতা। হ্রদে সরাসরি মিশেছে দু’টি ঝরনার ধারা।
অনেকের মতে, প্রায় ৫২ হাজার বছর আগে প্রবল বেগে ছুটে আসা উল্কা এসে পড়েছিল এই এলাকায়। তাতে বড়সড় গর্ত তৈরি হয়েছিল। পরে তা হ্রদে পরিণত হয়।
শুরুতে অনেকেই দাবি করেছিলেন, বেসাল্টিক শিলায় গড়ে ওঠা একটি গর্তের মধ্যে পানি জমেই লোনার হ্রদ তৈরি হয়েছে। সাধারণত, অগ্ন্যুৎপাতের পর লাভা দ্রুত ঠান্ডা হওয়ায় যে পাথরে পরিণত হয় সেগুলিই বেসাল্টিক শিলা।
ভূতত্ত্ববিদদের মতে, গোটা পৃথিবীতে মোটে চারটি বেসাল্টিক শিলায় গড়ে ওঠা গর্ত রয়েছে। তার মধ্যে একটি হলো লোনার হ্রদ।
প্রায় তিন হাজার ৯০০ ফুট ব্যাসার্ধের এই হ্রদের গভীরতা ৪৪৯ ফুট। হ্রদের চারপাশ ঘিরে রয়েছে ঢালু রিঙের মতো অংশ। যার ব্যাসার্ধ পাঁচ হাজার ৯০০ ফুট।
লোনার হ্রদের ডিম্বাকৃতি আকার দেখে বৈজ্ঞানিকদের দাবি, ৩৫ থেকে ৪০ ডিগ্রি বেঁকে উল্কাপাত হয়েছিল এখানে। হ্রদের আশপাশে মাটি ক্ষারীয় হওয়ায় কোনো কৃষিকাজ করা সম্ভব নয়। তবে গোমুখ, কমলজা-সহ বেশ কয়েকটি মন্দির গড়ে উঠেছে সেখানে।
হ্রদের অদূরে রয়েছে একশ বছরের পুরনো শ্রী গজানন মহারাষ্ট্র সংস্থান মন্দির। অনেকের দাবি, সেটি দেশের সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন মন্দির। এ ছাড়া, ষোড়শ শতকের সিন্দখেড রাজার দুর্গও দেখা যায় এই অঞ্চলে।
প্রাচীন ভারতের নানা গ্রন্থেও জায়গা করে নিয়েছে লোনার হ্রদ। স্কন্দপুরাণ এবং পদ্মপুরাণের মতো গ্রন্থে এর উল্লেখ রয়েছে। আবার মুঘল যুগে সম্রাট আকবরের শাসনকালে আবুল ফজলের রচিত ‘আইন-ই-আকবরি’-তেও এর কথা রয়েছে।
হ্রদের পানি শ্যাওলার রঙের মতো সবুজ বা সমুদ্রের জলের মতো নীল থেকে মাঝেমধ্যে গোলাপি হয়ে যায় কেনো? ডিম্বাকৃতি এই হ্রদে নাকি অগণিত হ্যালোআর্কিয়া জীবাণু রয়েছে। তাদের উপস্থিতিতেই হ্রদের পানি পাল্টে হয় গোলাপি।
জীববৈচিত্রের জন্যও এ হ্রদের সংরক্ষণ জরুরি বলে মনে করা হয়। ২০২০ সালের জুনে ২-৩ দিনের মধ্যে হ্রদের পানি লাল এবং গোলাপি হতে দেখা গিয়েছিল বলে দাবি।