সীতাকুণ্ড টু গুলিস্তান। পর পর তিনটি ভয়াবহ বিস্ফোরণ। প্রাণহানি হয়েছে
অনেকের। নিঃস্ব হয়েছে অনেকগুলো পরিবার। পাশাপাশি এই তিন বিস্ফোরণের ধরন
আতঙ্ক জাগিয়েছে সর্বত্র। বিশেষ করে রাজধানীর বাসিন্দাদের ভয় বাড়িয়েছে একের
পর এক বিস্ফোরণের ঘটনা। কেন ঘটেছে এই বিস্ফোরণ এখন পর্যন্ত এর সুর্নিদিষ্ট
কারণ জানা যায়নি। ঢাকার দু’টি বিস্ফোরণের ঘটনার ধরন প্রায় একই। সীতাকুণ্ডের
ঘটনাটি শিল্প কারখানায় হওয়ায় এর ধরন আলাদা।
ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) এর সদস্যরা তদন্তের পর জানিয়েছেন, আলামত
দেখে মনে হয়েছে এটি নাশকতার ঘটনা নয়। গ্যাস বিস্ফোরণ থেকেই এই ঘটনা ঘটতে
পারে। প্রশ্ন এমন ঘটনা ঘটার পর সংশ্লিষ্ট বিভাগের তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই কেন
সরকারি দলের পক্ষ থেকেই সন্দেহ প্রকাশ করা হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে
অনেকে বলছেন, সিরিজ ঘটনা রহস্যজনক। বড় কোনো ঘটনা আড়াল করতে কেউ এসব করছে
কিনা? যদিও সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তারা ঘটনাগুলোকে দুর্ঘটনা বলেই
মনে করছেন। সিদ্দিক বাজারের ঘটনার পরপরই সেনাবাহিনীর বোম ডিসপোজাল ইউনিটও
ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। এর আগে মিরপুর রোডে একটি ভবনে বিস্ফোরণের পরও
সেখানে এই টিম তদন্ত করে।
রাজধানীতে এই দুই ঘটনার পর এখন সাধারণ
নাগরিকরা আতঙ্কগ্রস্ত। কারণ দুর্ঘটনা হলেও এমন আরও অনেক ভবন আছে পুরো
নগরজুড়ে। যাতে যেকোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। এসব ভবনের ঝুঁকি তদারকি করার
মতো তৎপর কোনো সংস্থা নেই। সংস্থা থাকলেও জনবল নেই। নগর বিশেষজ্ঞরা বলছেন,
একের পর এক দুর্ঘটনা অপরিকল্পিত নগরায়নেরই ফল। রাজধানীতে গ্যাস, পানি,
বিদ্যুতের লাইন পরিকল্পিতভাবে করা হয়নি। এছাড়া পয়ঃবর্জ্য নিষ্কাশনের লাইনও
পরিকল্পিতভাবে করা হয়নি। এতে গ্যাস বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটছে অহরহ। এছাড়া দাহ্য
পদার্থ বহন ও মজুতের তদারকি দুর্বলতার কারণেও এমন ঘটনা ঘটছে।
শনিবার
সীতাকুণ্ডে একটি অক্সিজেন প্লান্টে বিস্ফোরণে অন্তত ৬ জন নিহত হয়েছেন। আহত
হন ২৫ জন। রোববার রাজধানীর সায়েন্সল্যাবে একটি ভবনে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।
এতে নিহত হয়েছেন ৩ জন। আহত হয়েছেন আরও ১৩ জন। একদিন বিরতি দিয়ে মঙ্গলবার
গুলিস্তানের সিদ্দিক বাজারে ঘটে ভয়াবহ দুর্ঘটনা। এতে এখনো পর্যন্ত ১৯ জনের
মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন শতাধিক মানুষ। এসব ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত
কমিটি গঠন করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আবদ্ধ জায়গায় স্বাভাবিক
মাত্রার থেকে বেশি ঘনত্বের গ্যাস থাকলে শর্টসার্কিট কিংবা দিয়াশলাই থেকে
বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। গ্যাসলাইন কিংবা সুয়্যারেজ লাইন থেকে মিথেন গ্যাস
জমতে পারে। আবার অনেক সময় গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হলেও বদ্ধ গ্যাস
পাইপলাইনে থেকে গেলে বিস্ফোরণ ঘটে। মূলত প্রাকৃতিক গ্যাসের মূল উপাদান
মিথেন অন্যসব গ্যাসের থেকে হালকা হওয়ার কারণে বাতাসে উড়তে থাকে। ফলে
পাইপলাইন লিকেজ হলে যেকোনো ফাঁকা জায়গা পেলে উপরে উঠে আসে। বদ্ধ পরিবেশ
পেলে সেখানে জমা হয়। পরবর্তীতে বিস্ফোরিত হয়।
মঙ্গলবার রাজধানীর
গুলিস্তানের সিদ্দিক বাজারে ক্যাফে কুইন ভবনে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।
এতে কমপক্ষে ১৯ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন শতাধিক। আহতদের অনেকের অবস্থা
আশঙ্কাজনক। বিকাল ৫টার দিকে ভয়াবহ এ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীরা
জানান, বিস্ফোরণে ভবনটির সব ফ্লোরই ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। ভয়াবহ বিস্ফোরণে
ভবনের সামনে চলাচলকারী পথচারীও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ফায়ার সার্ভিস প্রাথমিক
তদন্তে বলছে, ভবনটির বেজমেন্টে জমে থাকা গ্যাস থেকে বিস্ফোরণের ঘটনা
ঘটেছে। তবে ঘটনাটির কারণ অনুসন্ধানে গভীরভাবে তদন্ত করছে সরকারের সংশ্লিষ্ট
সংস্থাগুলো।
ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো.
মাইন উদ্দীন বিস্ফোরণের ঘটনাকে দুর্ঘটনা বলেই মনে করছেন। তিনি বলেন,
প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে এটা নিছক দুর্ঘটনা। তারপরেও তদন্ত চলছে। তদন্তের পর
পরিপূর্ণ তথ্য পাওয়া যাবে।
এর আগে রোববার ধানমণ্ডির সাইন্সল্যাব এলাকায়
একটি তিনতলা ভবনে বিস্ফোরণের ঘটনায় তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় আহত
হয়েছেন আরও ১৩ জন। সকাল ১০টা ৫০ মিনিটে প্রিয়াঙ্গন শপিং মলের পাশের ভবনে
বিকট শব্দে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। ফায়ার সার্ভিস জানায়, জমে থাকা গ্যাস থেকে
বিস্ফোরণের ঘটনাটি ঘটেছে। বিষয়টি ক্ষতিয়ে দেখতে ওই সময় সেনাবাহিনীর সহায়তা
চাওয়া হয়। পরে সেনাবাহিনীর বোম ডিসপোজাল টিমও জানায় বিস্ফোরণটি জমে থাকা
মিথেন গ্যাসের কারণে হয়েছে।
এ ঘটনার আগের দিন শনিবার চট্টগ্রামের
সীতাকুণ্ডের কদমরসুল এলাকায় সীমা রি-রোলিং মিলের অক্সিজেন প্লান্টে
বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এতে ৬ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ২৫ জনের বেশি।
প্রাথমিকভাবে অক্সিজেন সিলিন্ডারের কারণে বিস্ফোরণ হয়েছে বলা হলেও এখন
বিস্ফোরণের অন্য কারণ মনে করছে সংশ্লিষ্টরা। ধারণা করা হচ্ছে,
মেয়াদোত্তীর্ণ বয়লার বিস্ফোরণেই প্রাণহানি ও ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের সৃষ্টি
হয়েছে।
ফায়ার সার্ভিসের সাবেক উপ-পরিচালক (অপারেশন ও মেন্টেইনেন্স)
দেবাশীষ বর্ধন মানবজমিনকে বলেন, সিদ্দিক বাজারে বেজমেন্টে জমে থাকা গ্যাস
থেকে বিস্ফোরণ হয়েছে বলে আপাতত মনে হচ্ছে। সেখানে আগে রেস্টুরেন্টও ছিল।
তাই তিতাসের লাইন থেকেও মিথেন গ্যাস বের হতে পারে। জমে থাকা গ্যাসে শর্ট
সার্কিট থেকে আগুন লেগে বিস্ফোরণের ঘটনাটি ঘটেছে। এছাড়া স্যুয়ারেজ লাইন
থেকেও মিথেন গ্যাস জমে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটতে পারে। এর আগে সাইন্সল্যাবের
বিস্ফোরণও জমে থাকা গ্যাস থেকে হয়েছে। বিষয়টি তদন্তের মাধ্যমে বের হয়ে
আসবে।
তিনি বলেন, পরপর বিস্ফোরণের ঘটনাগুলোয় নাশকতা কি না তা
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তদন্ত করবেন। সেখানে গান পাউডারসহ কোনো বিস্ফোরক
দ্রব্য ছিল কি না সেটি তদন্তে বের হয়ে আসবে। তবে মালিক ও ব্যবহারকারীসহ
সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এসব দুর্ঘটনার দায় এড়াতে পারে না। সবাইকে এর
দায় নিতে হবে। রাজউক শুধু অনুমোদন দিয়ে বসে থাকলে চলবে না। তাদের নির্দেশনা
সঠিকভাবে মানা হয়েছে কিনা তা তদারকির দাবি রাখে। অন্যদিকে তিতাস গ্যাস ও
সিটি করপোরেশনকেও নিয়মিত পরিদর্শন করা উচিত।
ফায়ার সার্ভিসের সাবেক এ
কর্মকর্তা বলেন, এসব দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পেতে সবাইকে সচেতন হতে হবে।
মালিক থেকে শুরু করে ব্যবহারকারী ও সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান সবার নিয়মিত
তদারকির মাধ্যমে এ ধরনের বিস্ফোরণের ঘটনা বন্ধ করা সম্ভব।