চট্টগ্রাম অঞ্চলে রেকর্ড দুই লাখ ৭৯ হাজার ৩৫০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ
হচ্ছে। গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত লক্ষ্যমাত্রার ৯৯ শতাংশ জমিতে আবাদ শেষ
হয়েছে। মধ্য মার্চ পর্যন্ত চলবে আবাদ। এবার লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি জমিতে
চাষ হবে বলে জানিয়েছেন কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা। দেশে চলমান অর্থনৈতিক
মন্দা ও রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে ঊর্ধ্বমুখী ভোগ্যপণ্যের দাম।
বাজারে চালের দাম এখন প্রায় সাধারণের নাগালের বাইরে। টিসিবির চালের ট্রাকের
পেছনে হুমড়ি খেয়ে পড়ছে নিম্ন আয়ের মানুষ।
বিরূপ আবহাওয়া, সার,
জ্বালানিসহ কৃষি উপকরণের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির ফলে দেশে ধানের আবাদ ও
ফলন ক্রমাগতভাবে কমছে। এ অবস্থায় খাদ্য ঘাটতির আশঙ্কা প্রকট হচ্ছে। এ সঙ্কট
নিরসনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা
আবাদযোগ্য প্রতি ইঞ্চি মাটি কাজে লাগানোর আহ্বান জানিয়েছেন। এ
ধারাবাহিকতায় সরকারি তরফে চাষাবাদে চাষিদের উৎসাহিত করা হচ্ছে। দেয়া হচ্ছে
সার, বীজসহ নানা খাতে প্রণোদনা।
ডিজেল, বিদ্যুৎ, সার
ও বীজের দাম ঊর্ধ্বমুখী। নিয়মিত বিল পরিশোধ করেও মিলছে না বিদ্যুৎ। কৃষি
শ্রমিকের মজুরিও বেড়েছে। সব মিলিয়ে আবাদের খরচ অতীতের রেকর্ড অতিক্রম
করেছে। এরপরও ভালো ফলনের আশায় আবাদ বাড়িয়ে চলেছেন প্রান্তিক চাষিরা। বোরো
চাষে খরচ বেশি হলেও ফলন ভালো হয়। এ নিয়ে আশায় বুক বাঁধছে কৃষক। তবে সামনের
দিনগুলোতে সার ও ডিজেলের সরবরাহ স্বাভাবিক থাকবে কিনা এবং যথাসময়ে বিদ্যুৎ
মিলবে কিনা তা নিয়ে সংশয়ে রয়েছেন তারা। প্রান্তিক চাষিরা বলছেন, খাদ্য
নিরাপত্তা নিশ্চিতে সর্বশক্তি নিয়োগ করে মাঠে নেমেছেন তারা। কিন্তু ডিজেল ও
বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা না হলে সেচ নির্ভর এ আবাদে বিপর্যয় নেমে আসতে
পারে। কৃষকের এখন যত শঙ্কা সেচ নিয়ে।
কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা জানান,
সেচ নির্ভর হওয়া ভূগর্ভস্থ পানির স্তর স্বাভাবিক রাখতে গত কয়েক বছর ধরে
বোরো আবাদে কৃষকদের অনুৎসাহিত করা হচ্ছিল। পক্ষান্তরে আউশের আবাদ বাড়াতে
দেয়া হচ্ছে নানা প্রণোদনা। তবে খাদ্য ঘাটতির আশঙ্কা থেকে এবার বোরো চাষে
উৎসাহিত করা হচ্ছে কৃষকদের। এ লক্ষ্যে পুরো প্রস্তুতি নিয়েই মাঠে নামে কৃষি
বিভাগ। খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে কৃষকরাও এগিয়ে আসেন। এর ফলে এবার অন্য যেকোন
বছরের তুলনায় বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা বেশি নির্ধারণ করা হয়। চট্টগ্রাম
জেলায় এবার ৬৫ হাজার ৫০০ হেক্টরে বোরো আবাদে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা
হয়েছে। গতকাল পর্যন্ত আবাদ হয়েছে ৬২ হাজার ৫৫০ হেক্টরে। কক্সবাজারে ৫৪
হাজার ৭০০ হেক্টরের বিপরীতে আবাদ হয়েছে ৫১ হাজার ৬৯৪ হেক্টরে।
নোয়াখালীতে
লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৯৩ হাজার ২০০ হেক্টর। এ পর্যন্ত আবাদ হয়েছে ৯৭
হাজার ২৫ হেক্টরে। ফেনী জেলায় ৩০ হাজার ৪৫০ হেক্টরের বিপরীতে ৩০ হাজার ১৫১
হেক্টরে আবাদ হয়েছে। আর লক্ষ্মীপুর জেলায় ৩৫ হাজার ৫০০ হেক্টরের বিপরীতে
আবাদ হয়েছে ৩৪ হাজার ৭৯১ হেক্টরে। পাঁচ জেলায় দুই লক্ষ ৭৯ হাজার ৩৫০ হেক্টর
লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আবাদ হয়েছে দুই লাখ ৭৬ হাজার ২১১ হেক্টরে। যা
লক্ষ্যমাত্রার ৯৯ শতাংশ। এ অঞ্চলে বোরোর আবাদ শুরু হয় দেরিতে। সে হিসেবে
আগামী ১৫ মার্চ পর্যন্ত আবাদ চলবে। আর তাতে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে বলে
আশা করছেন কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা। উৎপাদন বাড়াতে এবার এ অঞ্চলের পাঁচ
জেলায় সর্বোচ্চ এক লাখ ৩৬ হাজার ৪৫৯ হেক্টরে হাইব্রিড এবং এক লাখ ৩৯ হাজার
৩৮৮ হেক্টরে উফশি জাতের বোরো আবাদ করা হয়েছে।
কৃষি বিভাগের
কর্মকর্তারা জানান, আবাদ ও ফলন বাড়াতে এবার প্রান্তিক চাষিদের বীজ ও সারে
প্রণোদনা দেয়া হয়েছে। এ পর্যন্ত উচ্চ ফলনশীল উফশি জাতের বীজ ব্যবহারের
মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক ৭৩ হাজার ৪০০ কৃষকের
মাঝে প্রণোদনা দেয়া হয়েছে। এছাড়া হাইব্রিড জাতের বীজ বিতরণের মাধ্যমে
প্রণোদনার আওতায় এসেছে এক লাখ ৩২ হাজার কৃষক। প্রথমবারের মত সমলয়ে চাষাবাদ
কর্মসূচি নেয় কৃষি বিভাগ। এ কর্মসূচির আওতায় এ অঞ্চলের সাতটি উপজেলায় সমলয়ে
চাষাবাদ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়। এ কর্মসূচির আওতায় ৫০৪ জন কৃষককে নগদ
প্রণোদনা দেয়া হয়। নির্দিষ্ট এলাকায় একাধিক কৃষকের মালিকানাধীন জমিতে একই
জাতের বোরো ধান চাষাবাদের উদ্যোগ নেয়া হয়। এতে একদিকে কৃষকের খরচ কমবে।
অন্যদিকে আবাদও ভালো হবে।
এ অবস্থায় সেচ যন্ত্র সচল রাখা না গেলে বোরো আবাদ মারাত্মক ব্যাহত হবে বলে আশঙ্কা করছেন চাষিরা। তবে বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, সরকার বোরো আবাদকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এজন্য সেচ মওসুমে প্রয়োজনে শহরে বিদ্যুৎ সরবরাহ কমিয়ে দিয়ে গ্রামে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা হবে। তাছাড়া সেচ যন্ত্র সচল রাখতে রাত থেকে ভোর পর্যন্ত গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক তথা লোডশেডিং না করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর চট্টগ্রাম অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক ড. অরবিন্দ কুমার রায় বলেন, কৃষি বিভাগের নানা উদ্যোগ বিশেষ করে বিনামূল্যে বীজ সরবরাহ করায় এবার বোরো আবাদে রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। যেসব এলাকায় সেচ সুবিধা রয়েছে সেসব এলাকার সব জমি চাষাবাদের আওতায় আনা হয়েছে। ফলে পানি সঙ্কট বা সেচের কোন সমস্যা হবে না। তাছাড়া সরকারের পক্ষ থেকে সেচের সময়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার উদ্যোগও রয়েছে। এ পর্যন্ত আবাদ যা হয়েছে তা অব্যাহত থাকলে সামনের দিনগুলোতে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে। তিনি আশাবাদী আমনের মত বোরোর ফলনেও লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করা যাবে।