সহজলভ্য আমিষ হিসেবে পরিচিত ব্রয়লার মুরগি ও ফার্মের ডিম এখন আর স্বল্প আয়ের মানুষের নাগালে নেই। গত এক মাসে পণ্য দুটির দাম কয়েক দফা বেড়েছে। ব্রয়লার মুরগির দাম বাড়তে বাড়তে ঠেকেছে ২২০ থেকে ২২৫ টাকায়। মাসের ব্যবধানে প্রায় আট টাকা বেড়েছে ডিমের হালিতে।
রাজধানীর মালিবাগ বাজারের মুরগি ব্যবসায়ী মো. ফারুক জানান, গতকাল সকালে কাপ্তান বাজারেই দাম এক লাফে অনেকখানি বেড়েছে। ফলে খুচরাতেও বাড়াতে হয়েছে তাদের। গতকাল তিনি ব্রয়লারের কেজি বিক্রি করেছেন ২২০ থেকে ২২৫ টাকা পর্যন্ত, যা এক মাস আগেও বিক্রি হয়েছে ১৪০ থেকে ১৫৫ টাকায়। সোনালি ও লেয়ার মুরগির দামও অনেক বাড়তি বলে জানান তিনি।
বাজারের যখন এমন হাল, তখন দাম বাড়ার জন্য একে অপরকে দায়ী করেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। আর খামারিরা বলছেন, নানা বিশৃঙ্খলার কারণে হুটহাট অস্থির হয়ে উঠছে বাজার। একদিনের বাচ্চার দাম আজ এক দামে বিক্রি হচ্ছে তো কাল আরেক দামে। অপরদিকে ব্যবসায়ী সমিতিগুলোর বেঁধে দেওয়া দামেই খামারিদের বিক্রি করতে হচ্ছে মুরগি ও ডিম। সেখানেও আবার পাকা রসিদ সরবরাহ করা হচ্ছে না। সরবরাহ করা হলেও রসিদে দাম উল্লেখ থাকে না। এসবের সুযোগ নিয়ে অতি মুনাফা করছে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ীরা। ঠকছেন খামারিরা।
আর অতিরিক্ত দামের কারণে ভোক্তার খাবারের পাত থেকে বাদ পড়ছে মুরগি ও ডিম।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমান বাজারে ব্রয়লার মুরগির একদিনের একটি বাচ্চার দাম ৬০ টাকা, যা গত মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে ছিল ৯ টাকা। গত মাসের ১৫ তারিখে ১৫ থেকে বেড়ে হয় ১৮ টাকা; এরপর ২৫ তারিখে ৩০ টাকা, ২৬ তারিখে ৩৬ টাকা, ৩০ তারিখে ৪০ টাকা দাম ছিল। ফেব্রুয়ারির ২ তারিখে ৩৯ থেকে ৪২ এবং ৫ তারিখে তা ৫৩ থেকে ৫৫ টাকায় কিনতে হয়েছে। এভাবে দফায় দফায় দাম বেড়ে গতকাল শুক্রবার ৬০ টাকাতেও বিক্রি হয়েছে।
একদিনের ‘বাচ্চার দামের ঠিক–ঠিকানা নেই’ বলে জানান পোলট্রি খামারিদের সংগঠন বাংলাদেশ পোলট্রি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সুমন হাওলাদার। গতকাল আমাদের সময়কে তিনি বলেন, মুরগি ও ডিমের বাজার বিশৃঙ্খলায় ভরা। হুটহাট বাচ্চার দাম বেড়ে যাচ্ছে। একদিনের বাচ্চার সম্পূর্ণ বাজার বড় করপোরেট কোম্পানিগুলোর হাতে। তারা এক মাস ধরে কয়েক দিন পর পর বাচ্চার দাম বাড়িয়েছে। গত মাসেও একদিনের যে বাচ্চা ৯ টাকায় পাওয়া গেছে, এখন তা ৬০ টাকা। মাঝে আমরা অনিয়ম নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করার পর দাম হঠাৎ অজানা কারণে এক লাফে কমে ৪০–৪৫ টাকা হয়েছিল। এখন আবার তা বেড়ে আগের জায়গায় ফিরেছে। করপোরেট কোম্পানিগুলোর স্বেচ্ছাচারিতার জন্য বাজারে অস্থিরতা দেখা দিচ্ছে। তাছাড়া কন্ট্রাক্ট ফার্মিংয়ের নামে বাজার নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিচ্ছে তারা। ফলে তারা তাদের সুবিধামতো মুরগি এবং ডিমের দাম নিয়ন্ত্রণ করছে।
তিনি আরও বলেন, এখনও রসিদবিহীন মুরগি–ডিম কেনাবেচা চলছে। পোলট্রিফিডের দামও হু হু করে বাড়ছে। বাজার নিয়ন্ত্রণের জন্য পোলট্রি বোর্ড গঠন জরুরি হয়ে পড়েছে। ২০১০ সালে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ১ মাসের সময় নিয়েছিল পোলট্রি ফিড, মুরগির বাচ্চা, ডিম ও মুরগির ন্যায্যমূল্য নির্ধারণের কৌশলপত্র তৈরির জন্য। কিন্তু তা এখনও হয়নি।
এর আগে গত সেপ্টেম্বরে ডিম বিক্রি হয় রেকর্ড দামে। সে সময় ব্রয়লারের দামও ২০০ টাকা ছাড়িয়ে যায়। বাজারে সরকারি সংস্থার বিশেষ অভিযান ও অনুসন্ধানে উঠে আসে কারসাজির তথ্য। অনুসন্ধানে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরও দেখতে পায়, মুরগি ও ডিমের আড়তে পাকা রসিদ সংরক্ষণ করা হয় না। ক্রয়মূল্যের ভিত্তিতে নয়, ব্যবসায়ী সমিতির নেতাদের নির্ধারিত দামে বিক্রি হয়। বাজারে অভিযানের পাশাপাশি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ডিম আমদানির হুশিয়ারিতে সে সময় রাতারাতি দাম কমে যায়। এরপর অনেকটা সময় ডিমের দাম স্থিতিশীল ছিল। রোজার আগে আবারও অস্থির হয়ে উঠছে বাজার।
বাজারে তদারকি, অভিযান কিংবা দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েও পরিস্থিতি বদলায়নি। আগের নিয়মেই বাজার চলছে বলে জানান খামারিরা। ঢাকা জেলার নবাবগঞ্জ থানার ‘ওরগানিক এগ্রোর’ ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম মিরাজুল হাসান ভুইয়া বলেন, আমরা খামারিরা আগের মতোই সিন্ডিকেটের হাতে জিম্মি। ব্যবসায়ী সমিতির নির্ধারিত দামেই মুরগি–ডিম বিক্রি করতে হয়। তাতে খামারিদের লাভ হোক আর লোকসানই হোক।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এএইচএম সফিকুজ্জামান বলেন, ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তর থেকে তো আর দাম নির্ধারণ করা হয় না। দাম নির্ধারণ করে দেওয়া থাকলে বাজার তদারকি আরও সহজ হতো। রমজান মাস সামনে রেখেও অনেকে বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়ানো চেষ্টা চালায়। আমরা বাজার তদারকি জোরদার করেছি। এরকম কিছু পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশনের (টিসিবি) গতকালের প্রতিবেদনও বলছে, মাসের ব্যবধানে ব্রয়লার মুরগির দাম ৪৫ দশমিক ৭৬ শতাংশ এবং ফার্মের ডিমের দাম ১৭ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে।
বাজার ও পাড়া মহল্লার দোকানগুলোতে ফার্মের ডিমের ডজন বিক্রি হচ্ছে ১৪০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত। প্রতি হালি ৫০ টাকাতেও বিক্রি হচ্ছে। গত মাসে ৪০ থেকে ৪২ টাকার মধ্যে এক হালি ডিম পাওয়া গেছে।
খামারিরা বলছেন, পোলট্রিফিডের দাম বছরের ব্যবধানে বস্তাপ্রতি (৫০ কেজি) ১২০০ থেকে ১৪০০ টাকা বেড়ে যাওয়ায় ডিমের দাম বেড়েছে। তবে খুচরায় বেশি বেড়েছে। রাজধানীর আশপাশের এলাকার খামারগুলোতে একটি ডিম বিক্রি হচ্ছে ১০ টাকা ৭০ পয়সা। প্রান্তিক পর্যায়ে আরেকটু কমে বিক্রি হয়। অথচ খুচরা এ ডিম বিক্রি হচ্ছে সাড়ে ১২ টাকায়, যা অস্বাভাবিক।
অস্বাভাবিক মূল্যের জন্য বাজার পর্যবেক্ষণের শিথিলতাকে দায়ী করেছেন কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান। তিনি বলেন, বাজারে হাত বদলের সংখ্যা কমাতে হবে। খামারিরা বারবার ব্যবসায়ী সমিতি ও করপোরেট কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগ দিচ্ছেন। এমনটা হলে তা খতিয়ে দেখা উচিত। কারসাজির প্রমাণ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।