রাখাল তো হারিয়ে যাওয়া মেষ খুঁজে ফেরে, আর এ কারণেই তাদের মনোনয়ন দেয়া হয়। যে রাখাল হিসেবে কাজে যোগদান করে, যোগ্যতানুসারে তাকে দিয়ে ভিন্ন কাজ করানো যেতে পারে, তবে মনে রাখতে হবে তার একমাত্র দায়িত্ব হলো হারানো মেষ খুঁজে ফেরা। উত্তম রাখাল জীবনভর নিজ নিজ কাজে থকে বিশ্বস্থ ও অনবদ্য।
মেষ পালে পালে চলে, তবে মেষ এমন ক্ষুদ্র স্মরণশক্তি সম্পন্ন, অর্থাৎ দুর্বল মনের অধিকারি, অতি সহজেই দিক হারিয়ে ফেলে; যে স্থান থেকে সে হারিয়ে গেল তথা নিজে নিজে আর ফিরে আসতে পারে না, তাকে অবশ্যই খুঁজে ফিরতে হবে, নিরুপিত খোয়ারে নিয়ে আসার জন্য।
নবী রাসুলদের তুলনা করা হয়েছে মেষের সাথে। তাদের উপর ন্যস্ত দায়িত্ব হলো বিপন্ন, বিপথগামী মানুষদের খুঁজে ফেরা, যেন তারা সেই আদি নিবাস, অর্থাৎ যেথা থেকে হারিয়ে গিয়েছে, সেখানে ফিরে আসতে পারে। তা তারা নিজেরা, এমন কোনো ক্ষমতা ধার্মিকতা রাখে না যে, স্ব উদ্দ্যোগে পিতৃগৃহে ফিরে আসতে পারবে; কষ্মিনকালেও পতিত গুনাহগার ব্যক্তি, নিজের ধার্মিকতার কসরতের বলে, ওখানে ফিরে যেতে পারবে না।
প্রশ্ন জাগতে পারে, তা কখন মানবজাতি হারিয়ে গেলো, হলো দূরিকৃত, তা অবশ্যই আমাদের জানতে হবে, মানতে হবে, তবেই না আমাদের বিতর্কের হবে অবসান। দুঃখ জাগে, ধর্ম নিয়ে বিতর্ক এতটাই জটিল পর্যায়ে পৌছে যায়, যার ফলে ভাই-ভাইকে হত্যা পর্যন্ত করে বসে। অবশ্য প্রথম খুনটি সংঘটিত হয়েছে স্বার্থের কারণে। কাবিল হাবিলকে খুন করে বসে শুধু মাংসিক কারণে। সম্ভবত এ কারণেই পাক কালামে বর্ণিত আছে, দেহের কামনা, চোখের লোভ ও সাংসারিক বিষয়ে আকর্ষণ মানুষকে বিভ্রান্ত করে, ঘটে মনুষ্যত্বের অবক্ষয়।
প্রসঙ্গক্রমে, প্রথম মানুষ আদম (আ.) হাওয়াকে নিয়ে আলোচনা করা যাক। আদম (আ.) সৃষ্টি হয়েছেন খোদার নিজ সুরতে, স্বীয় প্রতিনিধি হিসেবে। খোদার প্রতিনিধিত্ব করার প্রয়োজনে তিনি তাকে সর্বপ্রকার ঐশি গুনে করলেন সুসজ্জিত সর্বপ্রকার প্রজ্ঞা ধার্মিকতায়। খোদা তাকে দেখে সত্যিই অভিভুত হলেন, যেন নিজের অজান্তে বলে বসলেন ‘সর্বোত্তম’। জ্যি হ্যা, মানুষ হলো সৃষ্টির শ্রেঠ জীব, মানুষ হলো খোদার যোগ্য প্রতিনিধি।
খোদা হলেন এক রুহানি সত্ত্বা। তিনি বিমূর্ত, তাকে মূর্তিমান করার জন্য চাই এক মূর্ত প্রতিক, যিনি অদৃশ্য আলাহপাকের হবেন হুবহু জাহিরি প্রকাশ। বিতর্কিত হলেও সত্য, আদম হলেন খোদার প্রতিনিধি- খোদার সাথে সর্বপ্রকার দহরম সদালাপ চলতো আদমের সাথে। খোদা ফেরেশতাদের পর্যন্ত হুকুম দিলেন আদম (আ.) কে সেজদা দেবার জন্য। এতটা মর্যাদা দিলেন খোদা আদম (আ.) কে! আজকে কি আমরা তেমনটা ভাবতে পারি? আছে কি আমাদের মধ্যে তেমনটি দাবি করার কোনো অবশিষ্টাংশ কারণ। কাঁচের গ্লাস ফ্লোরে পড়ে শত টুকরো হয়ে গেলে উক্ত টুকরোগুলো চিরতরে হারিয়ে ফেলে মূল গ্লাসের উপযোগ। দুঃখের বিষয়, অভিশপ্ত ইবলিসের কুটচালে আদম পটে গেলেন, খোদার হুকম অবজ্ঞা করে ইবলিসের পরামর্শ প্রধান্য দিয়ে খোদা বিরোধি কাজ করে বসলেন। কাঁচের গ্লাস হলো ভূপাতিত, শতধা বিভক্ত চিরতরে হারিয়ে ফেললো মান-সম্মান প্রজ্ঞা ধার্মিকতা অধিকার কর্তব্য। মানুষ যেন আজ অমানুষে হলো পরিণত। মানুষ হয়ে পড়লো মানুষের ভোগ্য পন্ন; লুটতরাজ করে একজনের মুখের গ্রাস আর একজনের কাছে হয়ে দাড়ালো সুস্বাদু। এটা বিকৃত রুচি ছাড়া আর কি হতে পারে?
আসুন, আমাদের মূল আলোচ্য বিষয়ে এগিয়ে যাওয়া যাক। আর তা হলো রাখালের দায়িত্ব। মানুষকে সত্য সুন্দরের পথে ফিরিয়ে নেবার জন্য খোদা যাদের উপর দায়িত্ব আরোপ করেছেন সকলে তাদের সম্মান করে, কেননা তাদের দায়িত্ব ও অবদান অনস্বীকার্য। তাদের আমরা নবী-রাসুল হিসেবে চিনি। তারাও সকলে মানুষ, যেমন দেশের পার্লামেন্টের সাংসদগণ হলেন আমাদের মতো মানুষ, যাদের আমরা মনোনয়ন দিয়েছি, আমাদের পক্ষে কথা বলার জন্য। আর নবী-রাসুলগণ হলেন খোদার বাছাইকৃত মানুষ, যাদের বিশেষ নির্দেশনা দেয়া হয়েছে, পথভুলো মানুষদের সঠিক পথের অর্থাৎ খোদার সাথে পুনমির্লিত হবার পথে চলতে পারে, ফিরে আসতে পারে হারিয়ে যাওয়া সন্তান আপন পিতৃগৃহে।
এবার প্রশ্ন রাখা যেতে পারে, বিতাড়িত হবার পরে হযরত আদম ও হাওয়ার অবস্থা কি হয়েছিল? পাককালামের আলোকে বিষয়টি বিশ্লেষণ করা হয়েছে, বিতাড়িত হবার পর তাঁরা কেঁদেছেন, আপন ভুল বুঝতে পেরেছেন, খোদার কাছে আর্তি জানিয়েছেন পিতার সেই মনোনীত স্থানে অর্থাৎ এদন কাননে ফিরে যাবার জন্য, কিন্তু তাতে কোনো সুফল ফলে নি। এদন উদ্যানে ফিরে যাবার জন্য তথা বেহেশতি অধিকার ফিরে পাবার মতো মানুষের হাতে কোনো ব্যবস্থা অবশিষ্ট নেই, যার মাধ্যমে সে হৃত অধিকার ফিরে পেতে পারে।
মনে রাখতে হবে, আদম নিজেকে নিজে সৃষ্টি করেন নি, আর অমন মর্যাদা ও গুনাবলি দিয়ে নিজে নিজেকে ভুষিত করতে পারেন নি, আর তেমন ক্ষমতা কৌশল যুক্তি কোনো মানুষের হাতেই নেই। মানুষ কেবল খোদার রহমতে ফিরে পেতে পারে ঐশি যোগ্যতা অধিকার পরাক্রম। আমরা আমাদের অতীত পতিতদশা অবলীলাক্রমে ভুলে যাই বলে কখনো কখনো দর্পভরে কথা বলে বসি, যা হলো মানবীয় ভ্রান্তি।
কিতাবে তাই বর্ণিত রয়েছে, খোদার রহমে ঈমান আনিবার মাধ্যমে মানুষ পেতে পারে নাজাত, মুক্তি, স্বাধীনতা যা হলো খোদার দান। তিনি সে ব্যবস্থা স্থাপন করেছেন এক বিশেষ উপায়ে, চুড়ান্ত মূল্যে যা স্বার্থান্ধ মানুষের কল্পনার রাজ্যেও ধরা পড়ার কথা নয়। যেমন কাঁচের পান পাত্রের খন্ডিত অংশগুলো পান পাত্রের প্রকৃত উপযোগ সম্পূর্ণ হারিয়ে ফেলেছে। উক্ত অসহায় দুর্ভাগা খন্ডগুলো আজীবন পড়ে থাকবে আস্তাকুড়ে অবহেলিত অবস্থায়, যতদিন কেউ দয়াপরবশ হয়ে তথা হাজির না হবে তাদের সযতেœ চয়ন করে নতুনভাবে গড়ে না তুলেন নতুন সৃষ্টি হিসেবে গড়ে তুলতে। কালামে তাই একটি অভয়বাণী রয়েছে, যদি কেউ মসিহের সাথে যুক্ত হয় তবে সে সম্পূর্ণভাবে নতুন মানুষে পরিণত হয়ে ওঠে, তার মধ্যে পুরাতন কোনো কিছু আর খুঁজে পাবার নয়, তারা তখন থেকে গড়ে ওঠে এক নতুন সৃষ্টি হিসেবে, যাকে বলা চলে খোদার প্রকৃত প্রতিনিধি, যাকে দর্শণ লাভে মিটে যায়, খোদা দর্শনের সর্বাত্মক তৃর্ষ্ণা। মুলতঃ খোদা তো স্বীয় প্রতিনিধি হিসেবে মানুষ সৃষ্টি করেছেন, যদিও মানুষগুলো আজ সম্পূর্ণ Perverted বিকৃত মনের, বিকৃত রুচির, বিবেক তাদের আজ হয়ে পড়েছে স্বার্থান্ধ, তাদের আজ প্রকৃত মানবের কাতারে রাখা কঠিন বিষয় হয়ে দাড়িয়েছে।
খোদা মেহেরবান, তিনি মানুষের প্রতি নিয়ত করুনা প্রকাশ করে চলছেন, অসীম তাঁর ধৈর্য, সীমাহিন প্রেম, অফুরান ক্ষমতা, শত শ্রমেও তিনি থাকেন অক্লান্ত। আর যারাই তাঁর সাথে হতে পেরেছে যুক্ত, ঘোষণা করেছেন তাঁর সাথে একাত্মতা, তারাও খোদার বহুবিধ গুণ ও রুহানি ক্ষমতায় হয়েছেন সংক্রমিত, তাদের যেন কোনো ক্লান্তি নেই, মানুষ তাদের মান অপমান করতে কার্পণ্য করে না, তবুও তারা হাসিমুখে সকলকে ক্ষমা করে দিয়ে পুনরায় বুকে জড়িয়ে ধরেন। হাসিমুখে ঘাতকটিকেও ডাকেন প্রাণের ভায়া। ক্ষমার চুড়ান্ত নজীর আমরা দেখতে পাবো বেগুনাহ মসিহের, অভুতপূর্ব অতুল অনুপম, ক্ষমার মাধ্যমে। যিনি নিজের প্রাণ মর্মবিদারক সলিবে ত্যাগ করার পূর্বমূহুর্তে হাসি মুখে পিতার কাছে ফরিয়াদ জানালেন, ঘাতকদের ক্ষমা করার জন্য। অযুহাত হলো, তারা অবোধ, অজ্ঞ, কার সাথে কোন ধরণের ব্যবহার করছে তারা তা জানে না। গোটা বিশ্ববাসি আজ বড়ই অন্ধ, বলা চলে স্বার্থান্ধ, আপনাকে নিয়ে বড়ই ব্যস্ত, বিব্রতকর অবস্থায় সময় পার করে দিচ্ছে। গোটা বিশ্ব আজ বিপন্ন! মানুষ নিজেকে মুক্ত করার যে সকল ব্যবস্থা উদ্ভাবন করে চলছে, ব্যবহার করে চলছে, সবগুলো নিষ্ফল, অকার্যকর, পন্ডশ্রম মাত্র! মানুষ আজ শুধু বহুধাই নয়, তারা সকলে বিবদমানও বটে! পরষ্পরিক সম্পর্ক রয়েছে সাপ-নেউলে সম্পর্ক। অথচ মানুষের জন্ম হয়েছে একই মানুষের ঔরষ থেকে, সকলে একই পরিবার ভুক্ত, স্বীকার করুক বা না করুক, তাতে মৌলিক সত্ত্বার বা সত্যের ক্ষেত্রে হেরফের হতে পারে না, তেমন প্রশ্ন অবান্তর।
মানুষ অপরাধি, অবাধ্য, খোদাদ্রোহী- একদিকে শত্রুতা রয়েছে খোদার সাথে, যিনি হলেন পূতপবিত্র ক্ষমাধনের সীমাহিন পারাবার, আর একদিকে স্বজন-প্রিয়জন থেকে হয়ে আছে বৈরিতাপূর্ণ অবস্থানে দূরিকৃত! মানুষ এতটাই অমানুষ হয়ে পড়েছে যার বর্ণনা দেবার ভাষা খুঁজে পাওয়া হবে ভাড়। নিজ পরিবারের সাথেও তারা থাকে বিবদমান সম্পর্ক জিয়িয়ে রেখে। সিংহাসন অধিকারের কারণে পুত্র পিতাকে করেছে হত্যা। তাকেও আবার জেন্দাপীর বলে মান্য করার লোকের অভাব ঘটে না। কোনো নরঘাতিকে, নরঘাতি বলায়, অপরাধের কোনো কারণ থাকতে পারে কি? তাও কতিপয় বিভ্রান্ত মানুষ তেমন মানব নিধনকারীকে শ্রদ্ধাভরে কেশাগ্রের উপর তুলে চুড়ান্ত সম্মাননা প্রদর্শণ করে চলে। বিভ্রান্ত মানুষের কর্মকান্ড অনুসরণযোগ্য দৃষ্টান্ত হতে পারে কি? এ প্রশ্ন চক্ষুষ্মান ব্যক্তিবর্গের কাছে রাখলে একটা কিছু জবাব পাবার সম্ভাবনা থাকে!
মানুষ ভূমিষ্ট হবার পর থেকে তাকে বৃদ্ধি পেতে হয়, তাকে খাদ্যদ্রব্য অর্থাৎ সুসম খাদ্য খেয়ে কলায় কলায় বৃদ্ধিলাভ করতে হবে; একইভাবে, জ্ঞানবুদ্ধিতেও তাকে সুসম জ্ঞানভান্ডার থেকে, জ্ঞানন্বেষণ করে, জ্ঞানালোকে ধীমান হতে হবে, তবেই না সে পারবে পঙ্কিল বিশ্বে বন্ধুর পথে একাগ্রচিত্তে কাঙ্খিত লক্ষবিন্দুতে পৌছে যেতে। আমাদের চোখ খুলতে হবে! চাই আমাদের বাস্তবধর্মি বস্তুনিষ্ট জ্ঞান, ফটকাবাজদের কবল থেকে থাকতে হবে অবমুক্ত, চলার পথে আঁকা-বাঁকা পথ সরল করা সম্ভব হয়ে ওঠে না, তাই হাতে রাখা ষ্টিয়ারিং হুইলটি ডানে বায়ে সাবধানে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে তবে চলতে হবে। মজার বিষয় হলো, গাড়ির পথ রাজপথ অর্থাৎ আর রেলপথ এক ধরণের নয়। সে কারণে রেল ইঞ্জিলের কোনো ষ্টিয়ারিং হুইলের প্রয়োজন পড়ে না। ওর পায়ের নিচের রেল দুটো থাকে সরল, তাই সে ডানে বায়ে না ঘুরে অনায়াসে পৌছে যেতে পারে গন্তব্যে। তবে উভয় যানের যাত্রীদের ক্ষেত্রে নিরুদ্ধেগ থাকতে বলা হয়। যানবাহন পরিচালনার দায়িত্ব থাকে পাইলটের উপর। প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখি, মানুষের জীবনের পাইলট একজন আছেন, আর তিনি হলেন মানুষের মহান নির্মাতা, রক্ষাকর্তা, পালনকর্তা, খোদ মাবুদ নিজেই।
মানুষের জীবনের উপর দিয়ে তিনটি ধাপ কেটে যায়। একটি ধাপ হলো পাপ ও পতনের পূর্বাবস্থা আর একটি ধাপ হলো পতনের পরবর্তী অবস্থা যা আমরা বর্তমানে যাপন করে চলছি, আর একটি ধাপ হবে ‘মুক্তপাপ’ জীবন। আর উক্ত পরম কাঙ্খিত জীবনের প্রত্যাশা আশাকরি জীবন্ত সকল মানুষেরই আন্তরিক কামনা, নতুবা তারা নিত্যদিন কেন এতটা কৃচ্ছ্রসাধন করে চলছে দিবানিশি, আদাজল খেয়ে ধর্মীয় অনুষ্ঠানের ছুতোয়। তা কৃচ্ছ্রতার ফল যে কতোটা শুভকর হয়ে ফলে চলছে তা নিরীক্ষার দাবি রাখে। ব্যক্তি নিজেই আর্তস্বর করে ওঠে থেকে থেকে।
আসুন সকলে একটা প্রশ্ন রাখি, নবী-রাসুলদের প্রেরণ করা হলো মানুষ বিভক্ত করার জন্য না হারানো সন্তানদের খুঁজে খুঁজে একিভুত করার জন্য? নিশ্চয়ই মানুষকে বিচ্ছিন্ন এলোমেলো করার উদ্দেশ্যে তাদের মনোনয়ন দেয়া হয় নি, বরং হারানো সন্তানদের খুঁজে খুঁজে একই প্লাটফর্মে অর্থাৎ খোদার ক্রোড়ে পৌছে দেয়া তাদের উপর ন্যস্ত কর্তব্য। যদি তাঁরা তা না করে, নিজ নিজ খেয়াল খুশি মতো চলেন, তবে কি তাঁরা পার পেতে পারবেন? ভেবে দেখুন ইউনুস নবীর জীবনে কতটা শোকাবহ ক্লেষাত্মক ঘটনা ঘটেছিল খোদার বিরুদ্ধে চলতে গিয়ে। পরিশেষে খোদার মনোনীত স্থান নিনবিতেই তাকে পৌছাতে হয়েছিল। একজন নবীর জীবনে যদি খোদাদ্রোহীতার কুফল অতটা মারাত্মক হয়ে থাকে, তবে আমরা সাধারণ জনগণ, তেমন পাপ অপরাধের প্রতিফল কি পেতে পারি ভেবে দেখুন।
উপরোক্ত আলোচনার আলোকে আমরা একটা সিদ্ধান্তে উপনিত হতে পারি; খোদা চান না মানুষ বিচ্ছিন্ন থাক, পারষ্পরিক বিবদমান হয়ে একে অপরের ক্ষতি সাধন করুক বরং বিপরীত পক্ষে ঐশি প্রত্যাদেশ প্রাপ্ত ব্যক্তিদের নৈতিক দায়িত্ব হলো বিশৃঙ্খল বিবদমান গোটা বিশ্ববাসি আদম সন্তানদের এক প্লাটফর্মে অর্থাৎ খোদার ক্রোড়ে আশ্রয় গ্রহন করার জন্য অনুপ্রানীত করা, চেতনাদৃপ্ত করা। যারা নিজেদের এককভাবে বেহেশতের সুযোগ্য নাগরিক হিসেবে মনে করেন, আর বাকিরা প্রজ্জ্বলিত দোযখের জ্বালা যন্ত্রনার ভাগেদার হবে, এমন ভাবনা তো নিরেট খোদাদ্রোহীতা।
যদি কেউ মানুষকে বিভক্ত করে, তবে তাকে খোদার লোক বা আলাহ ওয়ালা বলে মেনে নিতে যথেষ্ট আপত্তি আছে। তা হবে ভুতের মুখে রামনামসম- খোদার নামে বা ধর্মের ছুতোয় সমাজে ইবলিসের হীন পরিকল্পনা কার্যকর করা, সাধারণ মানুষকে ধোকা দিয়ে বোকা বানানোর অসুভ চক্রান্ত।
মানুষের মধ্যে বর্তমানকার প্রচলিত বিভক্তি অবশ্যই ইবলিসের চক্রান্তের বাস্তবায়ন। যারা মানুষ খুন করে, মানুষের রক্ত নিয়ে কুৎসিৎ হলিখেলায় মেতে থাকে তারা আসলে মুখোসের আড়ালে ইবলিসের চেলাচামুন্ড। এদের কর্মকান্ড অবশ্যই তীক্ষ্ন নজরে রাখা হবে আমাদের কর্তব্য। এক শ্রেণির দুষ্টলোক বাজারে জাল নোট চালু করে নিজেদের আখের গুছাবার তালে রয়েছে ব্যস্ত, তাই ভোক্ত সম্প্রদায়কে নিজেদের স্বার্থে জালনোট আর আসল নোটের মধ্যে শুক্ষ পার্থক্য চিনে নিতে হবে, আর তা জনগণের জ্ঞাতার্থে তা প্রকাশ করার ব্যবস্থা নিতে হবে।
পরিশেষে আমরা একটি নিরেট সূত্র টানতে পারি, ইবলিসের কবল থেকে বিশ্বের সকল মানুষের মুক্তির উপায় হিসেবে, আর তা হলো যে মন্ত্রণা মানুষের ক্ষতি করে, বিভক্ত করে, ভিটে ছাড়া করে, মিলন ভ্রাতৃত্ত্বে ফাটল সৃষ্টি করে তা হলো অবশ্যই ইবলিসের মন্ত্রণা; আর যে মন্ত্রণা বা মতবাদ বিবদমান মানুষের মধ্যে শান্তি সমৃদ্ধি প্রতিষ্ঠাকল্পে অনন্ত নিশ্চয়তা প্রদান করে, তা অবশ্যই রহমতের পারাবার খোদ মাবুদের পক্ষ থেকে আগত, যা আমরা বিশ্বাসসহ শক্তভাবে ধারণ করতে পারি!
খোদাবন্দ হযরত ঈসা মসিহ হলেন একক সূত্র যিনি মানুষের জন্য খোদার দেয়া মুক্তি, শান্তি, স্বাধীনতা, মিলন ভ্রাতৃত্ব! নিজের পূতপবিত্র রক্তের মূল্যে তিনি বিশ্ববাসির পাপের কাফফারা শোধ দিয়েছেন, ফলে কেবল ঈমান রহমতে আজ সকলে হতে পেরেছে খোদার সন্তান হবার অভাবিত সুযোগ। কেবল মসিহের কোরবানির মাধ্যমে গুনাহগার হলেন গুনাহমুক্ত!
মেষ পালে পালে চলে, তবে মেষ এমন ক্ষুদ্র স্মরণশক্তি সম্পন্ন, অর্থাৎ দুর্বল মনের অধিকারি, অতি সহজেই দিক হারিয়ে ফেলে; যে স্থান থেকে সে হারিয়ে গেল তথা নিজে নিজে আর ফিরে আসতে পারে না, তাকে অবশ্যই খুঁজে ফিরতে হবে, নিরুপিত খোয়ারে নিয়ে আসার জন্য।
নবী রাসুলদের তুলনা করা হয়েছে মেষের সাথে। তাদের উপর ন্যস্ত দায়িত্ব হলো বিপন্ন, বিপথগামী মানুষদের খুঁজে ফেরা, যেন তারা সেই আদি নিবাস, অর্থাৎ যেথা থেকে হারিয়ে গিয়েছে, সেখানে ফিরে আসতে পারে। তা তারা নিজেরা, এমন কোনো ক্ষমতা ধার্মিকতা রাখে না যে, স্ব উদ্দ্যোগে পিতৃগৃহে ফিরে আসতে পারবে; কষ্মিনকালেও পতিত গুনাহগার ব্যক্তি, নিজের ধার্মিকতার কসরতের বলে, ওখানে ফিরে যেতে পারবে না।
প্রশ্ন জাগতে পারে, তা কখন মানবজাতি হারিয়ে গেলো, হলো দূরিকৃত, তা অবশ্যই আমাদের জানতে হবে, মানতে হবে, তবেই না আমাদের বিতর্কের হবে অবসান। দুঃখ জাগে, ধর্ম নিয়ে বিতর্ক এতটাই জটিল পর্যায়ে পৌছে যায়, যার ফলে ভাই-ভাইকে হত্যা পর্যন্ত করে বসে। অবশ্য প্রথম খুনটি সংঘটিত হয়েছে স্বার্থের কারণে। কাবিল হাবিলকে খুন করে বসে শুধু মাংসিক কারণে। সম্ভবত এ কারণেই পাক কালামে বর্ণিত আছে, দেহের কামনা, চোখের লোভ ও সাংসারিক বিষয়ে আকর্ষণ মানুষকে বিভ্রান্ত করে, ঘটে মনুষ্যত্বের অবক্ষয়।
প্রসঙ্গক্রমে, প্রথম মানুষ আদম (আ.) হাওয়াকে নিয়ে আলোচনা করা যাক। আদম (আ.) সৃষ্টি হয়েছেন খোদার নিজ সুরতে, স্বীয় প্রতিনিধি হিসেবে। খোদার প্রতিনিধিত্ব করার প্রয়োজনে তিনি তাকে সর্বপ্রকার ঐশি গুনে করলেন সুসজ্জিত সর্বপ্রকার প্রজ্ঞা ধার্মিকতায়। খোদা তাকে দেখে সত্যিই অভিভুত হলেন, যেন নিজের অজান্তে বলে বসলেন ‘সর্বোত্তম’। জ্যি হ্যা, মানুষ হলো সৃষ্টির শ্রেঠ জীব, মানুষ হলো খোদার যোগ্য প্রতিনিধি।
খোদা হলেন এক রুহানি সত্ত্বা। তিনি বিমূর্ত, তাকে মূর্তিমান করার জন্য চাই এক মূর্ত প্রতিক, যিনি অদৃশ্য আলাহপাকের হবেন হুবহু জাহিরি প্রকাশ। বিতর্কিত হলেও সত্য, আদম হলেন খোদার প্রতিনিধি- খোদার সাথে সর্বপ্রকার দহরম সদালাপ চলতো আদমের সাথে। খোদা ফেরেশতাদের পর্যন্ত হুকুম দিলেন আদম (আ.) কে সেজদা দেবার জন্য। এতটা মর্যাদা দিলেন খোদা আদম (আ.) কে! আজকে কি আমরা তেমনটা ভাবতে পারি? আছে কি আমাদের মধ্যে তেমনটি দাবি করার কোনো অবশিষ্টাংশ কারণ। কাঁচের গ্লাস ফ্লোরে পড়ে শত টুকরো হয়ে গেলে উক্ত টুকরোগুলো চিরতরে হারিয়ে ফেলে মূল গ্লাসের উপযোগ। দুঃখের বিষয়, অভিশপ্ত ইবলিসের কুটচালে আদম পটে গেলেন, খোদার হুকম অবজ্ঞা করে ইবলিসের পরামর্শ প্রধান্য দিয়ে খোদা বিরোধি কাজ করে বসলেন। কাঁচের গ্লাস হলো ভূপাতিত, শতধা বিভক্ত চিরতরে হারিয়ে ফেললো মান-সম্মান প্রজ্ঞা ধার্মিকতা অধিকার কর্তব্য। মানুষ যেন আজ অমানুষে হলো পরিণত। মানুষ হয়ে পড়লো মানুষের ভোগ্য পন্ন; লুটতরাজ করে একজনের মুখের গ্রাস আর একজনের কাছে হয়ে দাড়ালো সুস্বাদু। এটা বিকৃত রুচি ছাড়া আর কি হতে পারে?
আসুন, আমাদের মূল আলোচ্য বিষয়ে এগিয়ে যাওয়া যাক। আর তা হলো রাখালের দায়িত্ব। মানুষকে সত্য সুন্দরের পথে ফিরিয়ে নেবার জন্য খোদা যাদের উপর দায়িত্ব আরোপ করেছেন সকলে তাদের সম্মান করে, কেননা তাদের দায়িত্ব ও অবদান অনস্বীকার্য। তাদের আমরা নবী-রাসুল হিসেবে চিনি। তারাও সকলে মানুষ, যেমন দেশের পার্লামেন্টের সাংসদগণ হলেন আমাদের মতো মানুষ, যাদের আমরা মনোনয়ন দিয়েছি, আমাদের পক্ষে কথা বলার জন্য। আর নবী-রাসুলগণ হলেন খোদার বাছাইকৃত মানুষ, যাদের বিশেষ নির্দেশনা দেয়া হয়েছে, পথভুলো মানুষদের সঠিক পথের অর্থাৎ খোদার সাথে পুনমির্লিত হবার পথে চলতে পারে, ফিরে আসতে পারে হারিয়ে যাওয়া সন্তান আপন পিতৃগৃহে।
এবার প্রশ্ন রাখা যেতে পারে, বিতাড়িত হবার পরে হযরত আদম ও হাওয়ার অবস্থা কি হয়েছিল? পাককালামের আলোকে বিষয়টি বিশ্লেষণ করা হয়েছে, বিতাড়িত হবার পর তাঁরা কেঁদেছেন, আপন ভুল বুঝতে পেরেছেন, খোদার কাছে আর্তি জানিয়েছেন পিতার সেই মনোনীত স্থানে অর্থাৎ এদন কাননে ফিরে যাবার জন্য, কিন্তু তাতে কোনো সুফল ফলে নি। এদন উদ্যানে ফিরে যাবার জন্য তথা বেহেশতি অধিকার ফিরে পাবার মতো মানুষের হাতে কোনো ব্যবস্থা অবশিষ্ট নেই, যার মাধ্যমে সে হৃত অধিকার ফিরে পেতে পারে।
মনে রাখতে হবে, আদম নিজেকে নিজে সৃষ্টি করেন নি, আর অমন মর্যাদা ও গুনাবলি দিয়ে নিজে নিজেকে ভুষিত করতে পারেন নি, আর তেমন ক্ষমতা কৌশল যুক্তি কোনো মানুষের হাতেই নেই। মানুষ কেবল খোদার রহমতে ফিরে পেতে পারে ঐশি যোগ্যতা অধিকার পরাক্রম। আমরা আমাদের অতীত পতিতদশা অবলীলাক্রমে ভুলে যাই বলে কখনো কখনো দর্পভরে কথা বলে বসি, যা হলো মানবীয় ভ্রান্তি।
কিতাবে তাই বর্ণিত রয়েছে, খোদার রহমে ঈমান আনিবার মাধ্যমে মানুষ পেতে পারে নাজাত, মুক্তি, স্বাধীনতা যা হলো খোদার দান। তিনি সে ব্যবস্থা স্থাপন করেছেন এক বিশেষ উপায়ে, চুড়ান্ত মূল্যে যা স্বার্থান্ধ মানুষের কল্পনার রাজ্যেও ধরা পড়ার কথা নয়। যেমন কাঁচের পান পাত্রের খন্ডিত অংশগুলো পান পাত্রের প্রকৃত উপযোগ সম্পূর্ণ হারিয়ে ফেলেছে। উক্ত অসহায় দুর্ভাগা খন্ডগুলো আজীবন পড়ে থাকবে আস্তাকুড়ে অবহেলিত অবস্থায়, যতদিন কেউ দয়াপরবশ হয়ে তথা হাজির না হবে তাদের সযতেœ চয়ন করে নতুনভাবে গড়ে না তুলেন নতুন সৃষ্টি হিসেবে গড়ে তুলতে। কালামে তাই একটি অভয়বাণী রয়েছে, যদি কেউ মসিহের সাথে যুক্ত হয় তবে সে সম্পূর্ণভাবে নতুন মানুষে পরিণত হয়ে ওঠে, তার মধ্যে পুরাতন কোনো কিছু আর খুঁজে পাবার নয়, তারা তখন থেকে গড়ে ওঠে এক নতুন সৃষ্টি হিসেবে, যাকে বলা চলে খোদার প্রকৃত প্রতিনিধি, যাকে দর্শণ লাভে মিটে যায়, খোদা দর্শনের সর্বাত্মক তৃর্ষ্ণা। মুলতঃ খোদা তো স্বীয় প্রতিনিধি হিসেবে মানুষ সৃষ্টি করেছেন, যদিও মানুষগুলো আজ সম্পূর্ণ Perverted বিকৃত মনের, বিকৃত রুচির, বিবেক তাদের আজ হয়ে পড়েছে স্বার্থান্ধ, তাদের আজ প্রকৃত মানবের কাতারে রাখা কঠিন বিষয় হয়ে দাড়িয়েছে।
খোদা মেহেরবান, তিনি মানুষের প্রতি নিয়ত করুনা প্রকাশ করে চলছেন, অসীম তাঁর ধৈর্য, সীমাহিন প্রেম, অফুরান ক্ষমতা, শত শ্রমেও তিনি থাকেন অক্লান্ত। আর যারাই তাঁর সাথে হতে পেরেছে যুক্ত, ঘোষণা করেছেন তাঁর সাথে একাত্মতা, তারাও খোদার বহুবিধ গুণ ও রুহানি ক্ষমতায় হয়েছেন সংক্রমিত, তাদের যেন কোনো ক্লান্তি নেই, মানুষ তাদের মান অপমান করতে কার্পণ্য করে না, তবুও তারা হাসিমুখে সকলকে ক্ষমা করে দিয়ে পুনরায় বুকে জড়িয়ে ধরেন। হাসিমুখে ঘাতকটিকেও ডাকেন প্রাণের ভায়া। ক্ষমার চুড়ান্ত নজীর আমরা দেখতে পাবো বেগুনাহ মসিহের, অভুতপূর্ব অতুল অনুপম, ক্ষমার মাধ্যমে। যিনি নিজের প্রাণ মর্মবিদারক সলিবে ত্যাগ করার পূর্বমূহুর্তে হাসি মুখে পিতার কাছে ফরিয়াদ জানালেন, ঘাতকদের ক্ষমা করার জন্য। অযুহাত হলো, তারা অবোধ, অজ্ঞ, কার সাথে কোন ধরণের ব্যবহার করছে তারা তা জানে না। গোটা বিশ্ববাসি আজ বড়ই অন্ধ, বলা চলে স্বার্থান্ধ, আপনাকে নিয়ে বড়ই ব্যস্ত, বিব্রতকর অবস্থায় সময় পার করে দিচ্ছে। গোটা বিশ্ব আজ বিপন্ন! মানুষ নিজেকে মুক্ত করার যে সকল ব্যবস্থা উদ্ভাবন করে চলছে, ব্যবহার করে চলছে, সবগুলো নিষ্ফল, অকার্যকর, পন্ডশ্রম মাত্র! মানুষ আজ শুধু বহুধাই নয়, তারা সকলে বিবদমানও বটে! পরষ্পরিক সম্পর্ক রয়েছে সাপ-নেউলে সম্পর্ক। অথচ মানুষের জন্ম হয়েছে একই মানুষের ঔরষ থেকে, সকলে একই পরিবার ভুক্ত, স্বীকার করুক বা না করুক, তাতে মৌলিক সত্ত্বার বা সত্যের ক্ষেত্রে হেরফের হতে পারে না, তেমন প্রশ্ন অবান্তর।
মানুষ অপরাধি, অবাধ্য, খোদাদ্রোহী- একদিকে শত্রুতা রয়েছে খোদার সাথে, যিনি হলেন পূতপবিত্র ক্ষমাধনের সীমাহিন পারাবার, আর একদিকে স্বজন-প্রিয়জন থেকে হয়ে আছে বৈরিতাপূর্ণ অবস্থানে দূরিকৃত! মানুষ এতটাই অমানুষ হয়ে পড়েছে যার বর্ণনা দেবার ভাষা খুঁজে পাওয়া হবে ভাড়। নিজ পরিবারের সাথেও তারা থাকে বিবদমান সম্পর্ক জিয়িয়ে রেখে। সিংহাসন অধিকারের কারণে পুত্র পিতাকে করেছে হত্যা। তাকেও আবার জেন্দাপীর বলে মান্য করার লোকের অভাব ঘটে না। কোনো নরঘাতিকে, নরঘাতি বলায়, অপরাধের কোনো কারণ থাকতে পারে কি? তাও কতিপয় বিভ্রান্ত মানুষ তেমন মানব নিধনকারীকে শ্রদ্ধাভরে কেশাগ্রের উপর তুলে চুড়ান্ত সম্মাননা প্রদর্শণ করে চলে। বিভ্রান্ত মানুষের কর্মকান্ড অনুসরণযোগ্য দৃষ্টান্ত হতে পারে কি? এ প্রশ্ন চক্ষুষ্মান ব্যক্তিবর্গের কাছে রাখলে একটা কিছু জবাব পাবার সম্ভাবনা থাকে!
মানুষ ভূমিষ্ট হবার পর থেকে তাকে বৃদ্ধি পেতে হয়, তাকে খাদ্যদ্রব্য অর্থাৎ সুসম খাদ্য খেয়ে কলায় কলায় বৃদ্ধিলাভ করতে হবে; একইভাবে, জ্ঞানবুদ্ধিতেও তাকে সুসম জ্ঞানভান্ডার থেকে, জ্ঞানন্বেষণ করে, জ্ঞানালোকে ধীমান হতে হবে, তবেই না সে পারবে পঙ্কিল বিশ্বে বন্ধুর পথে একাগ্রচিত্তে কাঙ্খিত লক্ষবিন্দুতে পৌছে যেতে। আমাদের চোখ খুলতে হবে! চাই আমাদের বাস্তবধর্মি বস্তুনিষ্ট জ্ঞান, ফটকাবাজদের কবল থেকে থাকতে হবে অবমুক্ত, চলার পথে আঁকা-বাঁকা পথ সরল করা সম্ভব হয়ে ওঠে না, তাই হাতে রাখা ষ্টিয়ারিং হুইলটি ডানে বায়ে সাবধানে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে তবে চলতে হবে। মজার বিষয় হলো, গাড়ির পথ রাজপথ অর্থাৎ আর রেলপথ এক ধরণের নয়। সে কারণে রেল ইঞ্জিলের কোনো ষ্টিয়ারিং হুইলের প্রয়োজন পড়ে না। ওর পায়ের নিচের রেল দুটো থাকে সরল, তাই সে ডানে বায়ে না ঘুরে অনায়াসে পৌছে যেতে পারে গন্তব্যে। তবে উভয় যানের যাত্রীদের ক্ষেত্রে নিরুদ্ধেগ থাকতে বলা হয়। যানবাহন পরিচালনার দায়িত্ব থাকে পাইলটের উপর। প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখি, মানুষের জীবনের পাইলট একজন আছেন, আর তিনি হলেন মানুষের মহান নির্মাতা, রক্ষাকর্তা, পালনকর্তা, খোদ মাবুদ নিজেই।
মানুষের জীবনের উপর দিয়ে তিনটি ধাপ কেটে যায়। একটি ধাপ হলো পাপ ও পতনের পূর্বাবস্থা আর একটি ধাপ হলো পতনের পরবর্তী অবস্থা যা আমরা বর্তমানে যাপন করে চলছি, আর একটি ধাপ হবে ‘মুক্তপাপ’ জীবন। আর উক্ত পরম কাঙ্খিত জীবনের প্রত্যাশা আশাকরি জীবন্ত সকল মানুষেরই আন্তরিক কামনা, নতুবা তারা নিত্যদিন কেন এতটা কৃচ্ছ্রসাধন করে চলছে দিবানিশি, আদাজল খেয়ে ধর্মীয় অনুষ্ঠানের ছুতোয়। তা কৃচ্ছ্রতার ফল যে কতোটা শুভকর হয়ে ফলে চলছে তা নিরীক্ষার দাবি রাখে। ব্যক্তি নিজেই আর্তস্বর করে ওঠে থেকে থেকে।
আসুন সকলে একটা প্রশ্ন রাখি, নবী-রাসুলদের প্রেরণ করা হলো মানুষ বিভক্ত করার জন্য না হারানো সন্তানদের খুঁজে খুঁজে একিভুত করার জন্য? নিশ্চয়ই মানুষকে বিচ্ছিন্ন এলোমেলো করার উদ্দেশ্যে তাদের মনোনয়ন দেয়া হয় নি, বরং হারানো সন্তানদের খুঁজে খুঁজে একই প্লাটফর্মে অর্থাৎ খোদার ক্রোড়ে পৌছে দেয়া তাদের উপর ন্যস্ত কর্তব্য। যদি তাঁরা তা না করে, নিজ নিজ খেয়াল খুশি মতো চলেন, তবে কি তাঁরা পার পেতে পারবেন? ভেবে দেখুন ইউনুস নবীর জীবনে কতটা শোকাবহ ক্লেষাত্মক ঘটনা ঘটেছিল খোদার বিরুদ্ধে চলতে গিয়ে। পরিশেষে খোদার মনোনীত স্থান নিনবিতেই তাকে পৌছাতে হয়েছিল। একজন নবীর জীবনে যদি খোদাদ্রোহীতার কুফল অতটা মারাত্মক হয়ে থাকে, তবে আমরা সাধারণ জনগণ, তেমন পাপ অপরাধের প্রতিফল কি পেতে পারি ভেবে দেখুন।
উপরোক্ত আলোচনার আলোকে আমরা একটা সিদ্ধান্তে উপনিত হতে পারি; খোদা চান না মানুষ বিচ্ছিন্ন থাক, পারষ্পরিক বিবদমান হয়ে একে অপরের ক্ষতি সাধন করুক বরং বিপরীত পক্ষে ঐশি প্রত্যাদেশ প্রাপ্ত ব্যক্তিদের নৈতিক দায়িত্ব হলো বিশৃঙ্খল বিবদমান গোটা বিশ্ববাসি আদম সন্তানদের এক প্লাটফর্মে অর্থাৎ খোদার ক্রোড়ে আশ্রয় গ্রহন করার জন্য অনুপ্রানীত করা, চেতনাদৃপ্ত করা। যারা নিজেদের এককভাবে বেহেশতের সুযোগ্য নাগরিক হিসেবে মনে করেন, আর বাকিরা প্রজ্জ্বলিত দোযখের জ্বালা যন্ত্রনার ভাগেদার হবে, এমন ভাবনা তো নিরেট খোদাদ্রোহীতা।
যদি কেউ মানুষকে বিভক্ত করে, তবে তাকে খোদার লোক বা আলাহ ওয়ালা বলে মেনে নিতে যথেষ্ট আপত্তি আছে। তা হবে ভুতের মুখে রামনামসম- খোদার নামে বা ধর্মের ছুতোয় সমাজে ইবলিসের হীন পরিকল্পনা কার্যকর করা, সাধারণ মানুষকে ধোকা দিয়ে বোকা বানানোর অসুভ চক্রান্ত।
মানুষের মধ্যে বর্তমানকার প্রচলিত বিভক্তি অবশ্যই ইবলিসের চক্রান্তের বাস্তবায়ন। যারা মানুষ খুন করে, মানুষের রক্ত নিয়ে কুৎসিৎ হলিখেলায় মেতে থাকে তারা আসলে মুখোসের আড়ালে ইবলিসের চেলাচামুন্ড। এদের কর্মকান্ড অবশ্যই তীক্ষ্ন নজরে রাখা হবে আমাদের কর্তব্য। এক শ্রেণির দুষ্টলোক বাজারে জাল নোট চালু করে নিজেদের আখের গুছাবার তালে রয়েছে ব্যস্ত, তাই ভোক্ত সম্প্রদায়কে নিজেদের স্বার্থে জালনোট আর আসল নোটের মধ্যে শুক্ষ পার্থক্য চিনে নিতে হবে, আর তা জনগণের জ্ঞাতার্থে তা প্রকাশ করার ব্যবস্থা নিতে হবে।
পরিশেষে আমরা একটি নিরেট সূত্র টানতে পারি, ইবলিসের কবল থেকে বিশ্বের সকল মানুষের মুক্তির উপায় হিসেবে, আর তা হলো যে মন্ত্রণা মানুষের ক্ষতি করে, বিভক্ত করে, ভিটে ছাড়া করে, মিলন ভ্রাতৃত্ত্বে ফাটল সৃষ্টি করে তা হলো অবশ্যই ইবলিসের মন্ত্রণা; আর যে মন্ত্রণা বা মতবাদ বিবদমান মানুষের মধ্যে শান্তি সমৃদ্ধি প্রতিষ্ঠাকল্পে অনন্ত নিশ্চয়তা প্রদান করে, তা অবশ্যই রহমতের পারাবার খোদ মাবুদের পক্ষ থেকে আগত, যা আমরা বিশ্বাসসহ শক্তভাবে ধারণ করতে পারি!
খোদাবন্দ হযরত ঈসা মসিহ হলেন একক সূত্র যিনি মানুষের জন্য খোদার দেয়া মুক্তি, শান্তি, স্বাধীনতা, মিলন ভ্রাতৃত্ব! নিজের পূতপবিত্র রক্তের মূল্যে তিনি বিশ্ববাসির পাপের কাফফারা শোধ দিয়েছেন, ফলে কেবল ঈমান রহমতে আজ সকলে হতে পেরেছে খোদার সন্তান হবার অভাবিত সুযোগ। কেবল মসিহের কোরবানির মাধ্যমে গুনাহগার হলেন গুনাহমুক্ত!