বাদ-বিভেদ, যা চলার পথে হতেই পারে, হয়েও চলছে, তাই বলে তা জিয়িয়ে রাখা পুতপবিত্রতা ও শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বিরাট বিঘ্নদায়ক কান্ড; সুস্থ পরিবেশ ধরে রাখতে হলে মানুষে মানুষে পুনরায় মিলন ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করার তাগিদ, মহাজ্ঞানি খোদা নিজেই ঘোষণা দিয়েছেন। ‘তোমরা এক হও… (ইউহোন্না ১৩ ঃ ৩৪)
আশারা শব্দটি দশ বা দশম শব্দের আরবি রূপ। যেমন আশারায়ে মোবশ্বেরিন অর্থাৎ সুখবর প্রাপ্ত দশজন। সংখ্যা গণনা অনেক পরে শুরু হয়েছে। হযরত আদম (আঃ) এর সময় কোনো পঞ্জিকার প্রচলন হয় নি। আর তখন দিন গণনা করার কোনো প্রয়োজনও ছিল না, যেমন কোনো ব্যক্তি, নিশ্বাস-প্রশ্বাস গ্রহন করার জন্য, দিনপঞ্জির সাহায্য নেয় না, যদি তেমন ভাব কেউ প্রকাশ করে, তবে তাকে তার স্বজন-প্রিয়জন ও সুভাকাঙ্খিগণ ধরে নিয়ে যায় কোনো পাগলের চিকিৎসকের কাছে, কেননা বেঁচে থাকার জন্য অত্যাবশ্যকীয় অক্সিজেন দিনপঞ্জি দেখে কেউ টানে না। ঠিক একইভাবে বলা চলে, খোদার সাথে সু-সম্পর্ক স্থাপন করার জন্য বিশেষ কোনো দিন তারিখ বা লগ্নের প্রয়োজন পড়ে না। তিনি সর্বত্র বিরাজমান, সর্বদর্শী, অন্তর্যামি মাবুদ, তাকে ডাকার জন্য যে সকল আনুষ্ঠানিকতা সমাজে প্রচলিত প্রতিষ্ঠিত দেখা যাচ্ছে তা কেবল পঞ্জিকা নির্মাতারাই চালু রেখেছে। তাছাড়া আশুরার তাজিয়া নিয়ে মিছিলকারীরা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে বাশট্টি হিজরির ১০ই মহরমের দিনে ইয়াজিদ বাহিনী কতটা নৃশংসভাবে হাসান বাহিনীকে যুদ্ধে পরাভুত ও হত্যা করলো।
এটি একটি রক্তক্ষয়ি বিভেদ, ভাই ভাইয়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। কিন্তু আজ পর্যন্ত কেউ এগিয়ে আসলোনা, বিভেদ মিটিয়ে দিয়ে উভয় পক্ষকে মিলন ভ্রাতৃত্বের বাঁধনে বেধে দিতে; বরং প্রতি বছর বিভেদের দেয়ালটাকে চুনকাম করে পরিপূর্ণ কর্মক্ষম করে দেয়া হয়; এটা অবশ্যই ইবলিসের কাজ, যা হলো মানুষের বিরুদ্ধে মানুষ লেলিয়ে দেয়া, বেল দিয়ে বেল ভাঙ্গা, মানুষ দিয়ে মানুষ কচুকাটা করা, তাও নাকি ধর্মের পবিত্রতা রক্ষার স্বার্থে। হায়রে ধর্মান্ধের দল, তোমরা আর কতোটা নীচে নামবে!
যেক্ষেত্রে, খোদার সার্বিক সৃষ্টি রক্ষার জন্য পরামর্শ হলো, মানুষে মানুষে মিলন ভ্রাতৃত্ব স্থাপন করা, সেক্ষেত্রে কেবল ইবলিসই চিরকাল করে আসছে খোদার বিরোধিতা, আর বোকার হদ্দ আমরা, কালামপাকের অর্থ না বুঝে, উদ্ধত শানিত তরবারি নিয়ে, ঝাপিয়ে পড়ি মানুষ হত্যা করার পৈশাচিক উম্মাদনায়।
কোথাও আমি বলেছি, ধর্মের দুই কাঁধে, দুটি অপশক্তি ভর করেছে, আর তা হলো ‘রাজনীতি’ আর ‘অর্থনীতি’। দুটি জগদ্দল পাথর নিয়ে ধর্ম আজ অচল হয়ে পড়েছে। এ পাথর দুটি অপসারণ না করা পর্যন্ত, স্বমহিমায় ধর্ম আত্মপ্রকাশ করতে পারছে না। মসিহ তাই ধনি যুবককে বলেছিলেন, সে যেন তার ধন ঐশ্বর্য গরীবদের মধ্যে বিতরণ করার পরে তার পদাঙ্ক অনুসরণ করে। উক্ত যুবকের জন্য তার অর্জিত ধন-ঐশ্বর্য মারাত্মক অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছিল মসিহের পথে চলার জন্য (লুক ১৮ ঃ ১৮-৩০)।
যা কিছু আমাদের অন্তরায় বা বিঘ্ন সৃষ্টি করে সত্য সুন্দরের পথে চলাচলে, তা অবশ্যই পরিত্যাগ করতে হবে, খোদার পথে পথ চলার জন্য। মসিহ অভয়বানী দিয়েছেন, যদি কেউ পার্থিব স্বার্থ পরিত্যাগ করে মসিহের রাজ্য ও ধার্মিকতা নিয়ে ব্যস্ত হয়, তখন মসিহের দায়িত্ব ও কর্তব্য হয়ে দাঁড়ায়, তার যাবতীয় প্রয়োজন যোগান দেয়া (মথি ৬ ঃ ৩৩)।
বিশ্বাস হলো এক মহাশক্তি যা ব্যক্তির অন্তরে জন্ম নিয়ে কলায় কলায় বৃদ্ধি লাভ করে। বলতে পারেন, মহিলাদের গর্ভে একটি শুক্রকীটের অনুপ্রবেশ লাভ! যদি উক্ত কীটটি জীবিত থাকে, তবে অবশ্যই তা কলায় কলায় বৃদ্দি লাভ করবে, উক্ত মহিলার দেহ-বলরিতে পরিবর্তনশীল প্রভাব বইতে থাকবে, তার রুচির ঘটবে পরিবর্তন, যেমন কথায় বলে, আগে যা খেতাম এখন তা খেতে পারি না… আমার পরিবর্তন হয়েছে। তা কেউ জানুক বা নাইবা জানলো বা নাইবা মানলো সমাজ, খোদা কিন্তু তা মেনে নিয়েছে এবং উক্ত মানব শিশুটিকে যতœগঠন প্রবৃদ্ধি দিয়ে ভূমিষ্ট হবার ব্যবস্থা নিয়েছেন। খোদা সইতে পারলে তুমি আমি আপত্তি করার কে?
আমরা ভুলে যাবো অতীতের ঝগড়া-ফাসাদের স্মৃতিগুলো, পুনরায় সৃষ্টি করবো মিলন ভ্রাতৃত্ব। খোদা তো তাই আমাদের নিরন্তর শিক্ষা দিয়ে চলছেন। নবী-রাসুলদের কাছে যে সকল পয়গাম বা বার্তা প্রেরণ করেছেন, উক্ত পয়গাম সমূহের মর্মার্থ হলো, ‘মানুষ যেন বাদ-বিভেদ অপকর্ম পারষ্পরিক হানাহানি, মারামারি, যুদ্ধবিগ্রহ পত্যিাগ করে সাধুসন্তের মতো মাবুদের দরবারে এক কাতারে এসে সামিল হয়, যা হলো পরমকরুনাময় খোদার একক ইচ্ছার বহিপ্রকাশ। যদিও নবীদের সংখ্যা লক্ষাধিক, তবুও তাদের পয়গাম একক খোদার কাছ থেকে এসেছে, একই উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করার জন্য। কোনো একটা নির্দেশ রয়েছে খোদার কালামে, ‘লানু ফাররেকু বাইনা আহাদেমমের রুসুলিহি’ অর্থাৎ নবীদের মধ্যে তোমরা ভাগাভাগি করো না। মাত্র একটি উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্যই তারা সকলে হলেন প্রেরিত।
আজ আমাদের মধ্যে যতো প্রকার বিভেদের দেয়াল দাঁড়িয়ে আছে, আসুন ওগুলো ভূমিস্মাৎ করে ফেলি, যেমনটা করেছে, মানবপ্রেমে প্রদীপ্ত, জার্মান স¤প্রদায়। তাদের বিভক্তকারী বার্লীন প্রাচীর, গণরোশে হয়ে গেল ধুলিস্মাৎ। উক্ত সময় আমি জার্মানীতেই অধ্যয়নরত ছিলাম, যে কারণে স্বচক্ষে তা প্রত্যক্ষ করার সুযোগ হয়েছে। গণ জোয়ারের মুখে যে কোনো বাধা-বিন্দাচল খড়কুটোসম সহজেই ভেসে যায়, যেমনটা হয়েছে চীন জাতির ক্ষেত্রে, সমাজ সংস্কারক মাওসেতুং এর নেতৃত্বে, যেমনটা ঘটেছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবর রহমানের দ্বারা, গোটা বাঙ্গালি জাতিকে এক করলেন, চেতনাদৃপ্ত করলেন; সৃষ্টি করলেন উত্তাল গণজোয়ার, যার মুখে টিকতে পারলোনা কুখ্যাত ইয়াহিয়া-টিক্কা খানের পশুশক্তির জগদ্দল পাথর।
চাই চেতনা! খোদা মানুষ সৃষ্টি করেছেন স্বাধীন করে। প্রত্যেকটি মানুষ জন্ম সূত্রে খোদার সন্তান, তাঁর প্রতিনিধিত্ব করার জন্য আহুত মনোনিত। অন্তরায় সৃষ্টি করে রেখেছে অভিশপ্ত ইবলিস, যে কিনা তার অপকর্ম শুরু করেছে খোদ এদন-উদ্দান থেকে, প্রথম নর-নারী আদম-হাওয়াকে শান্তিকুটির থেকে বিতাড়িত করার মাধ্যমে। তাদের চেতনার শরীরে ঢুকিয়ে দিল মারাত্মক বিষ যা পরবর্তী সময়ে, বংশ বংশানুক্রমে, উত্তরাধিকার সূত্রে, প্রত্যেকটি আদমের মধ্যে প্রবাহিত হয়ে চলছে। অদ্য যে শিশুটি জন্ম লাভ করলো, সেও বাদ পারলো না বিষের উত্তরাধিকার থেকে। আর জানেনইতো, জন্মসূত্রে প্রাপ্ত অধিকার ভোগ করার জন্য দলিল দস্তাবেজ একপ্রস্থ কমই প্রয়োজন হয়। কথায় বলে জন্মগত অধিকার।
কোনো ব্যক্তির শরীরে যদি মারাত্মক রোগের জীবাণু থাকে, আর উক্ত সময় তার ঔরষ থেকে কোনো সন্তান যদি জন্মলাভ করে, তবে উক্ত নবজাতক, উত্তরাধিকার হিসেবে, উক্ত ব্যধি স্বয়ংক্রিয়ভাবে লাভ করবে। আদম-হাওয়ার অবাধ্যতার কুফল তাঁদের পুত্র কাবিলের মধ্যে পরিষ্কার দেখতে পাই, যে কিনা পার্থিব স্বার্থের মোহে স্বীয় সহোদর হাবিলকে হত্যা করে বসলো।
মানুষের জীবনে রয়েছে অগণিত অবক্ষয়, যার হিসেব নিকেশ নেই তার জানা। বিশ্বাস করা হয় ‘কেরামন কাতেবিন’ নামক দুই ফেরেশতা দুই কাঁধে বসে অনবরত লিখে চলছেন, মানুষের দ্বারা নিত্যদিন ঘটে যাওয়া কর্মকান্ড। ভালো-মন্দ সবকিছুই নাকি তারা নোট করে চলছে। সবকিছুর চুলচেড়া বিচার হবে কাল কেয়ামতের ময়দানে। তা বাপু, এতটাই যখন বুঝতে পারো, তবে বাদ-বিভেদের স্মৃতিগুলো প্রতি বৎসর পলস্তরণ করে তরতাজা রাখছো কোন কারণে, ঐ সকল কুলক্ষুণে ঘটনাসমূহ ভুলে গিয়ে, পারষ্পরিক ক্ষমা ও মহব্বতে এক জন আর একজনের সাথে কেন মিলিত হচ্ছো না? এর মানে কি এই নয়, আজ পর্যন্ত বিভেদের বিষ তোমাদের নিয়ত জ্বালিয়ে মারছে, যে কারণে মিলন ভ্রাতৃত্বের বাধনে পরষ্পরকে বাধতে হচ্ছে মারাত্মক সমস্যা।
চাই এক বিশেষ শক্তি, বিশেষ সাহায্য যা আসবে উপর থেকে, যা হবে খোদার হুবহু প্রকাশ, সম কর্মক্ষম, সে তো চোরা বালিতে ডুবতে পারে না যেমন জগদ্বাসী ডুবে আছে। তিনি, অর্থাৎ ঐশি নাজাতদাতা তো আদমের ঔরষজাত হতে পারেন না। তাকে তো অবশ্যই থাকতে হবে নিষ্কলুষ, সম্পূর্ণ বেগুনাহ, যিনি অবশ্যই হবেন বাতেনি খোদার হুবহু প্রকাশ, মানুষের পাপের কাফফারা পরিশোধ দেবার ক্ষমতা রাখেন এবং প্রেমের আতিশয্যে তিনি স্বেচ্ছায় আত্মকোরবানি দিলেন গোটা বিশ্ববাসিকে ‘মুক্তপাপ’ বলে ঘোষণা দেবার জন্য।
তিনি আর কেউ নন, কুমারী মরিয়মের গর্ভজাত, মানবরূপে ভুমিষ্ট হলেন খোদার জীবন্ত কালাম ও পাকরূহ, খোদাবন্দ হযরত ঈসা মসিহ। একমাত্র মসিহ হলেন বিশ্বের তাবৎ আদম সন্তানদের মুক্তিদাতা, যিনি অভিশপ্ত ইবলিসের মস্তক অর্থাৎ তার অশুভ পরিকল্পনা সম্পূর্ণরূপে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিলেন। মানুষ হয়ে গেল সম্পূর্ণ মুক্ত ও স্বাধীন। আসলে তো খোদার রহমতে আজ আমরা হতে পেরেছি স্বাধীন মুক্তপাপ (ইফিষীয় ২ ঃ ৮-১০)।
ধন্য সেই ব্যক্তি যিনি মিলন করিয়ে দেয়। মসিহ হলেন তেমন ব্যক্তি যিনি মানব খোদায় মিলন ঘটালেন, তথা মিলন ঘটালেন মানুষের সাথে মানুষের। তিনিই একমাত্র ধন্য সর্বজন বরেণ্য নাজাতদাতা।
মসিহের সাথে সখ্যতা লাভের পর বিভেদের আর কোনো জের ধরে রাখার প্রয়োজন নেই। কাঁটাতারের বেড়া হোক অথবা কংক্রিটের দেয়াল হোক, সকল বিভেদের বস্তু ঘৃণাভরে ছুড়ে মারুন অনন্ত প্রজ্জ্বলিত আস্তাকুড়ে।
আশারা শব্দটি দশ বা দশম শব্দের আরবি রূপ। যেমন আশারায়ে মোবশ্বেরিন অর্থাৎ সুখবর প্রাপ্ত দশজন। সংখ্যা গণনা অনেক পরে শুরু হয়েছে। হযরত আদম (আঃ) এর সময় কোনো পঞ্জিকার প্রচলন হয় নি। আর তখন দিন গণনা করার কোনো প্রয়োজনও ছিল না, যেমন কোনো ব্যক্তি, নিশ্বাস-প্রশ্বাস গ্রহন করার জন্য, দিনপঞ্জির সাহায্য নেয় না, যদি তেমন ভাব কেউ প্রকাশ করে, তবে তাকে তার স্বজন-প্রিয়জন ও সুভাকাঙ্খিগণ ধরে নিয়ে যায় কোনো পাগলের চিকিৎসকের কাছে, কেননা বেঁচে থাকার জন্য অত্যাবশ্যকীয় অক্সিজেন দিনপঞ্জি দেখে কেউ টানে না। ঠিক একইভাবে বলা চলে, খোদার সাথে সু-সম্পর্ক স্থাপন করার জন্য বিশেষ কোনো দিন তারিখ বা লগ্নের প্রয়োজন পড়ে না। তিনি সর্বত্র বিরাজমান, সর্বদর্শী, অন্তর্যামি মাবুদ, তাকে ডাকার জন্য যে সকল আনুষ্ঠানিকতা সমাজে প্রচলিত প্রতিষ্ঠিত দেখা যাচ্ছে তা কেবল পঞ্জিকা নির্মাতারাই চালু রেখেছে। তাছাড়া আশুরার তাজিয়া নিয়ে মিছিলকারীরা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে বাশট্টি হিজরির ১০ই মহরমের দিনে ইয়াজিদ বাহিনী কতটা নৃশংসভাবে হাসান বাহিনীকে যুদ্ধে পরাভুত ও হত্যা করলো।
এটি একটি রক্তক্ষয়ি বিভেদ, ভাই ভাইয়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। কিন্তু আজ পর্যন্ত কেউ এগিয়ে আসলোনা, বিভেদ মিটিয়ে দিয়ে উভয় পক্ষকে মিলন ভ্রাতৃত্বের বাঁধনে বেধে দিতে; বরং প্রতি বছর বিভেদের দেয়ালটাকে চুনকাম করে পরিপূর্ণ কর্মক্ষম করে দেয়া হয়; এটা অবশ্যই ইবলিসের কাজ, যা হলো মানুষের বিরুদ্ধে মানুষ লেলিয়ে দেয়া, বেল দিয়ে বেল ভাঙ্গা, মানুষ দিয়ে মানুষ কচুকাটা করা, তাও নাকি ধর্মের পবিত্রতা রক্ষার স্বার্থে। হায়রে ধর্মান্ধের দল, তোমরা আর কতোটা নীচে নামবে!
যেক্ষেত্রে, খোদার সার্বিক সৃষ্টি রক্ষার জন্য পরামর্শ হলো, মানুষে মানুষে মিলন ভ্রাতৃত্ব স্থাপন করা, সেক্ষেত্রে কেবল ইবলিসই চিরকাল করে আসছে খোদার বিরোধিতা, আর বোকার হদ্দ আমরা, কালামপাকের অর্থ না বুঝে, উদ্ধত শানিত তরবারি নিয়ে, ঝাপিয়ে পড়ি মানুষ হত্যা করার পৈশাচিক উম্মাদনায়।
কোথাও আমি বলেছি, ধর্মের দুই কাঁধে, দুটি অপশক্তি ভর করেছে, আর তা হলো ‘রাজনীতি’ আর ‘অর্থনীতি’। দুটি জগদ্দল পাথর নিয়ে ধর্ম আজ অচল হয়ে পড়েছে। এ পাথর দুটি অপসারণ না করা পর্যন্ত, স্বমহিমায় ধর্ম আত্মপ্রকাশ করতে পারছে না। মসিহ তাই ধনি যুবককে বলেছিলেন, সে যেন তার ধন ঐশ্বর্য গরীবদের মধ্যে বিতরণ করার পরে তার পদাঙ্ক অনুসরণ করে। উক্ত যুবকের জন্য তার অর্জিত ধন-ঐশ্বর্য মারাত্মক অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছিল মসিহের পথে চলার জন্য (লুক ১৮ ঃ ১৮-৩০)।
যা কিছু আমাদের অন্তরায় বা বিঘ্ন সৃষ্টি করে সত্য সুন্দরের পথে চলাচলে, তা অবশ্যই পরিত্যাগ করতে হবে, খোদার পথে পথ চলার জন্য। মসিহ অভয়বানী দিয়েছেন, যদি কেউ পার্থিব স্বার্থ পরিত্যাগ করে মসিহের রাজ্য ও ধার্মিকতা নিয়ে ব্যস্ত হয়, তখন মসিহের দায়িত্ব ও কর্তব্য হয়ে দাঁড়ায়, তার যাবতীয় প্রয়োজন যোগান দেয়া (মথি ৬ ঃ ৩৩)।
বিশ্বাস হলো এক মহাশক্তি যা ব্যক্তির অন্তরে জন্ম নিয়ে কলায় কলায় বৃদ্ধি লাভ করে। বলতে পারেন, মহিলাদের গর্ভে একটি শুক্রকীটের অনুপ্রবেশ লাভ! যদি উক্ত কীটটি জীবিত থাকে, তবে অবশ্যই তা কলায় কলায় বৃদ্দি লাভ করবে, উক্ত মহিলার দেহ-বলরিতে পরিবর্তনশীল প্রভাব বইতে থাকবে, তার রুচির ঘটবে পরিবর্তন, যেমন কথায় বলে, আগে যা খেতাম এখন তা খেতে পারি না… আমার পরিবর্তন হয়েছে। তা কেউ জানুক বা নাইবা জানলো বা নাইবা মানলো সমাজ, খোদা কিন্তু তা মেনে নিয়েছে এবং উক্ত মানব শিশুটিকে যতœগঠন প্রবৃদ্ধি দিয়ে ভূমিষ্ট হবার ব্যবস্থা নিয়েছেন। খোদা সইতে পারলে তুমি আমি আপত্তি করার কে?
আমরা ভুলে যাবো অতীতের ঝগড়া-ফাসাদের স্মৃতিগুলো, পুনরায় সৃষ্টি করবো মিলন ভ্রাতৃত্ব। খোদা তো তাই আমাদের নিরন্তর শিক্ষা দিয়ে চলছেন। নবী-রাসুলদের কাছে যে সকল পয়গাম বা বার্তা প্রেরণ করেছেন, উক্ত পয়গাম সমূহের মর্মার্থ হলো, ‘মানুষ যেন বাদ-বিভেদ অপকর্ম পারষ্পরিক হানাহানি, মারামারি, যুদ্ধবিগ্রহ পত্যিাগ করে সাধুসন্তের মতো মাবুদের দরবারে এক কাতারে এসে সামিল হয়, যা হলো পরমকরুনাময় খোদার একক ইচ্ছার বহিপ্রকাশ। যদিও নবীদের সংখ্যা লক্ষাধিক, তবুও তাদের পয়গাম একক খোদার কাছ থেকে এসেছে, একই উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করার জন্য। কোনো একটা নির্দেশ রয়েছে খোদার কালামে, ‘লানু ফাররেকু বাইনা আহাদেমমের রুসুলিহি’ অর্থাৎ নবীদের মধ্যে তোমরা ভাগাভাগি করো না। মাত্র একটি উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্যই তারা সকলে হলেন প্রেরিত।
আজ আমাদের মধ্যে যতো প্রকার বিভেদের দেয়াল দাঁড়িয়ে আছে, আসুন ওগুলো ভূমিস্মাৎ করে ফেলি, যেমনটা করেছে, মানবপ্রেমে প্রদীপ্ত, জার্মান স¤প্রদায়। তাদের বিভক্তকারী বার্লীন প্রাচীর, গণরোশে হয়ে গেল ধুলিস্মাৎ। উক্ত সময় আমি জার্মানীতেই অধ্যয়নরত ছিলাম, যে কারণে স্বচক্ষে তা প্রত্যক্ষ করার সুযোগ হয়েছে। গণ জোয়ারের মুখে যে কোনো বাধা-বিন্দাচল খড়কুটোসম সহজেই ভেসে যায়, যেমনটা হয়েছে চীন জাতির ক্ষেত্রে, সমাজ সংস্কারক মাওসেতুং এর নেতৃত্বে, যেমনটা ঘটেছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবর রহমানের দ্বারা, গোটা বাঙ্গালি জাতিকে এক করলেন, চেতনাদৃপ্ত করলেন; সৃষ্টি করলেন উত্তাল গণজোয়ার, যার মুখে টিকতে পারলোনা কুখ্যাত ইয়াহিয়া-টিক্কা খানের পশুশক্তির জগদ্দল পাথর।
চাই চেতনা! খোদা মানুষ সৃষ্টি করেছেন স্বাধীন করে। প্রত্যেকটি মানুষ জন্ম সূত্রে খোদার সন্তান, তাঁর প্রতিনিধিত্ব করার জন্য আহুত মনোনিত। অন্তরায় সৃষ্টি করে রেখেছে অভিশপ্ত ইবলিস, যে কিনা তার অপকর্ম শুরু করেছে খোদ এদন-উদ্দান থেকে, প্রথম নর-নারী আদম-হাওয়াকে শান্তিকুটির থেকে বিতাড়িত করার মাধ্যমে। তাদের চেতনার শরীরে ঢুকিয়ে দিল মারাত্মক বিষ যা পরবর্তী সময়ে, বংশ বংশানুক্রমে, উত্তরাধিকার সূত্রে, প্রত্যেকটি আদমের মধ্যে প্রবাহিত হয়ে চলছে। অদ্য যে শিশুটি জন্ম লাভ করলো, সেও বাদ পারলো না বিষের উত্তরাধিকার থেকে। আর জানেনইতো, জন্মসূত্রে প্রাপ্ত অধিকার ভোগ করার জন্য দলিল দস্তাবেজ একপ্রস্থ কমই প্রয়োজন হয়। কথায় বলে জন্মগত অধিকার।
কোনো ব্যক্তির শরীরে যদি মারাত্মক রোগের জীবাণু থাকে, আর উক্ত সময় তার ঔরষ থেকে কোনো সন্তান যদি জন্মলাভ করে, তবে উক্ত নবজাতক, উত্তরাধিকার হিসেবে, উক্ত ব্যধি স্বয়ংক্রিয়ভাবে লাভ করবে। আদম-হাওয়ার অবাধ্যতার কুফল তাঁদের পুত্র কাবিলের মধ্যে পরিষ্কার দেখতে পাই, যে কিনা পার্থিব স্বার্থের মোহে স্বীয় সহোদর হাবিলকে হত্যা করে বসলো।
মানুষের জীবনে রয়েছে অগণিত অবক্ষয়, যার হিসেব নিকেশ নেই তার জানা। বিশ্বাস করা হয় ‘কেরামন কাতেবিন’ নামক দুই ফেরেশতা দুই কাঁধে বসে অনবরত লিখে চলছেন, মানুষের দ্বারা নিত্যদিন ঘটে যাওয়া কর্মকান্ড। ভালো-মন্দ সবকিছুই নাকি তারা নোট করে চলছে। সবকিছুর চুলচেড়া বিচার হবে কাল কেয়ামতের ময়দানে। তা বাপু, এতটাই যখন বুঝতে পারো, তবে বাদ-বিভেদের স্মৃতিগুলো প্রতি বৎসর পলস্তরণ করে তরতাজা রাখছো কোন কারণে, ঐ সকল কুলক্ষুণে ঘটনাসমূহ ভুলে গিয়ে, পারষ্পরিক ক্ষমা ও মহব্বতে এক জন আর একজনের সাথে কেন মিলিত হচ্ছো না? এর মানে কি এই নয়, আজ পর্যন্ত বিভেদের বিষ তোমাদের নিয়ত জ্বালিয়ে মারছে, যে কারণে মিলন ভ্রাতৃত্বের বাধনে পরষ্পরকে বাধতে হচ্ছে মারাত্মক সমস্যা।
চাই এক বিশেষ শক্তি, বিশেষ সাহায্য যা আসবে উপর থেকে, যা হবে খোদার হুবহু প্রকাশ, সম কর্মক্ষম, সে তো চোরা বালিতে ডুবতে পারে না যেমন জগদ্বাসী ডুবে আছে। তিনি, অর্থাৎ ঐশি নাজাতদাতা তো আদমের ঔরষজাত হতে পারেন না। তাকে তো অবশ্যই থাকতে হবে নিষ্কলুষ, সম্পূর্ণ বেগুনাহ, যিনি অবশ্যই হবেন বাতেনি খোদার হুবহু প্রকাশ, মানুষের পাপের কাফফারা পরিশোধ দেবার ক্ষমতা রাখেন এবং প্রেমের আতিশয্যে তিনি স্বেচ্ছায় আত্মকোরবানি দিলেন গোটা বিশ্ববাসিকে ‘মুক্তপাপ’ বলে ঘোষণা দেবার জন্য।
তিনি আর কেউ নন, কুমারী মরিয়মের গর্ভজাত, মানবরূপে ভুমিষ্ট হলেন খোদার জীবন্ত কালাম ও পাকরূহ, খোদাবন্দ হযরত ঈসা মসিহ। একমাত্র মসিহ হলেন বিশ্বের তাবৎ আদম সন্তানদের মুক্তিদাতা, যিনি অভিশপ্ত ইবলিসের মস্তক অর্থাৎ তার অশুভ পরিকল্পনা সম্পূর্ণরূপে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিলেন। মানুষ হয়ে গেল সম্পূর্ণ মুক্ত ও স্বাধীন। আসলে তো খোদার রহমতে আজ আমরা হতে পেরেছি স্বাধীন মুক্তপাপ (ইফিষীয় ২ ঃ ৮-১০)।
ধন্য সেই ব্যক্তি যিনি মিলন করিয়ে দেয়। মসিহ হলেন তেমন ব্যক্তি যিনি মানব খোদায় মিলন ঘটালেন, তথা মিলন ঘটালেন মানুষের সাথে মানুষের। তিনিই একমাত্র ধন্য সর্বজন বরেণ্য নাজাতদাতা।
মসিহের সাথে সখ্যতা লাভের পর বিভেদের আর কোনো জের ধরে রাখার প্রয়োজন নেই। কাঁটাতারের বেড়া হোক অথবা কংক্রিটের দেয়াল হোক, সকল বিভেদের বস্তু ঘৃণাভরে ছুড়ে মারুন অনন্ত প্রজ্জ্বলিত আস্তাকুড়ে।