হে বঙ্গবন্ধু, জাতির পিতা,
তোমাকে জানাতে চাই দু’টি কথা,
যা জমেছিল সুদীর্ঘ চল্লিশটি বছর ধরে
আমার এ-ক্ষুদ্র স্মৃতির পাতে।
সেদিন আমার সৌভাগ্য জুটেছিল
তোমাকে বরণমালা পরাতে, করযুগলে।
তখন তুমি আসীন ছিলে সম্মানের আসনে,
দুর্নীতি দমন বিভাগে, তদানীন্তন পাকিস্তানে।
তুমি গিয়েছিলে এক নিভৃত পল্লীতে,
নবকুমার বিদ্যালয়ে, শুভেচ্ছা সফরে আমাদের গাঁয়ে।
তখন কতোটা লোক জানতো, তোমার মাঝে লুকিয়ে আছে
এতো প্রতিভা, এতো প্রেম, এতো প্রত্যয়, দেশজনতার তরে?
নিজ প্রাণ বিলিয়ে দেয়া তোমার কাছে ছিল স্বাধীনতার নজরানা।
আমি পেয়েছিলাম সেদিন বুকের মাঝে,
আজও আছো মোর শ্রদ্ধা-ভক্তির রাজে;
তোমাকে বরণমালা পরিয়ে নিজেকে ধন্য মনে করেছি।
তাকিয়েছিলাম সতীর্থদের মুখে, গর্বভরে।
ওরা দেখেছে পুলক, আবেগ, আনন্দাশ্রæ প্রবাহিত দু’গÐ বেয়ে।
আমাকে ডেকেছিলেন প্রধানশিক্ষক, মালা পরানোর দায়িত্ব পালনে,
হয়তো বিশিষ্ট ভেবে!
পরমানন্দে, ভীরুহৃদে, ধীর পদে, কম্পিত হস্তে,
পরিয়েছিলাম তোমার গলে।
স্মিতহাস্যে আমার পানে তাকালে,
আমি ধন্য হলাম।
জানতাম না, এটাই ছিলো শেষ দেখা তোমার সনে।
তারপর কেটেছে বহুবছর, নিভৃতে, সিক্ত চোখ মুছে মুছে।
আজও আছে বরফগলা লোনা জলের ধারা মম গন্ডকূপে,
কেউ নেই এগিয়ে আসে মুছাতে।
পথভ্রষ্ট, দিকভ্রষ্ট, নরাধম মূর্খমানব যত ক্ষতি করেছে,
অপূরণীয় ক্ষতি জাতির পিতাকে হত্যা করে।
তুমি গোটা জাতিকে এক করলে, পারষ্পরিক ভ্রান্তি দূর করলে,
মৈত্রী গড়লে, শক্তি-চেতনা জোগালে,
গণজোয়ারে দু’কূল ভাসানো স্ফীত বান, শুরু হলো আন্দোলন,
অপ্রতিরোধ্য গতি, ভেসে গেল খড়কুটোসম,
হানাদার বাহিনীর সর্বাত্মক ব্যারিকেড,
পুড়ে ছাই হলো সব বাধা, সব অন্তরায় জনরোষে।
হলো স্বাধীনদেশের উদ্ভব, নাম বাংলাদেশ।
দু’হাত বাড়িয়ে, পরম তৃপ্তিভরে, সমাদরে তুলে নিলে পোড়ামাটি,
হানাদার বাহিনী সব পুড়ে ছাই করে ছাড়লো,
বাংলা মায়ের অযুত অমূল্য সম্পদ।
চিনাপাত্রের ঘরে ঘটেছিল বলদের প্রবেশ,
সব চূরমার, একাকার, নেই যোগাযোগ ব্যবস্থা;
নেই অন্ন, নেই বস্ত্র, নেই বাসস্থান, সহজপন্থা,
বিধ্বস্ত একটি দেশ, গুরুভার তুলে নিয়ে স্বীয় স্কন্ধে,
যেন সর্বহারা বিধবা ভিখারিনী মা,
একগাদা সন্তানের মুখে যোগাবে দু’মুঠো খানা।
ভিক্ষের ঝুলি নিয়ে, দুয়ারে দুয়ারে তাই ভিক্ষামাগা।
তুমি কিছুই জানতে না, জানতে না তারাই তোমার ঘাতক
যাদের তরে বুক পেতে দিয়েছিলে মেশিনগানের মুখে,
তোমার আপন সন্তান হলো তোমার হন্তা, পিতৃহন্তা।
আমি বন্দি ছিলাম হায়দ্রাবাদে, মাতৃভূমে ফিরে যাবার অপরাধে।
পালিয়ে পার পেলাম না, ধরা পড়তে হলো।
একটানা দু’যুগসম দু’টি বছর, কেটে গেল নির্জন প্রকোষ্ঠে,
তুমি ভোলনি মোদের কথা,
মোদের ব্যথা, তা তো তোমারই ব্যথা।
ব্যবস্থা নিলে বন্দি-মুক্ত করার, আপন সন্তান স্বদেশে ফিরে পাবার।
স্বাধীনদেশের মুক্ত মাটি, আহা! বড়োই খাঁটি।
ফিরে এসে আমোদ করেছি, খেলেছি লুটোপুটি।
রাজাকার, আলবদর, যারা রাখেনি দেশের কদর,
অকাতরে ক্ষমেছিলে সেদিন ভেবে সহোদর।
জানতে না, ভাবতে না ওরাই যে বিভীষণ, দোষর ঘাতক দলের,
বদলায়নি ওদের চরিত্র, কেবল ভেজাবিড়াল,
লুকানো নখর, অতীব ধারালো, অপেক্ষা সময় সুযোগের।
একটু অসাবধানতা, তবেই আড়িপাতা।
বিয়ের বাসর, শত মেহমান, আত্মীয়-কুটুম, আনন্দ ফুর্তি, মহাধুম,
সবার অলক্ষে, সবার অগোচরে নিশাচর ঘাতকের দল
চালালো উপর্যুপরি আক্রমণ, এলোপাথাড়ি গুলি,
নিভে গেল দীপশিখা, জাতীয় বেদী থেকে।
সুসজ্জিত নগর, ভেঙ্গেচুরে চুরমার করে দিল,
কোথাকার সর্বনাশী ঝড়।
তারপর হাতবদলের পালা,
শান্তির নামে বাড়লো জ্বালা।
নব্যহানাদার, রাজাকার, আলবদর,
শাসন করলো, শোষণ করলো, হাড়মাংসে কালি মাখালো,
কেবল নিরীহ দেশজনতার।
তুমি দূরে থেকে দেখলে, যোগালে প্রেরণা, যোগালে উদ্দীপনা,
চুপিসারে সেখানে কৌশল, হারাধন ফিরে পাবার সম্ভাবনা।
আত্মজা তব নাছোড়াবান্দা, মান-অপমান, জেল-হাজত,
জীবনের হুমকি, কিছুতেই নেই পরোয়া।
জীবনবাজি রেখে আন্দোলন, সংগ্রাম,
শেষ পর্যন্ত বিজয় দেশপ্রেমিকের,
মুক্তি পেল বারোকোটি সন্তান তোমার