এম এ ওয়াহাব
জল শিক্ত করে, আদ্র করে নোংরা বস্তু ধুয়ে ফেলে, স্থানান্তির করে, ভাসিয়ে নিয়ে যায়, তৃষ্ণা নিবারণ করে, স্থান-কাল-পাত্র ভেদে নিজের রূপ বদলায়। জলের আর এক নাম হলো জীবন, যা প্রত্যেকটি প্রাণীর ক্ষেত্রে সমগুরুত্বপূর্ণ, উদ্ভিজ ও গাছপালা জল ছাড়া বাঁচতে পারে না। স্রোতাস্বিনী মরু হয় জলের অভাবে যা আমরা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি বাংলার বুকে। জল না হলে আমরা মৃত, শরীরের ৭৫% জলের প্রয়োজন। এ জল নিয়ে খল বলুন আর ছল বলুন তা ধর্মের কারণে ঘটে না, কেবল ব্যক্তি স্বার্থ রক্ষার জন্যই হয়ে থাকে। অবশ্য ব্যক্তি স্বীয় স্বার্থ রক্ষা করে তবেই তাকে বাঁচতে হবে, তাকে হুশিয়ার থাকতে হবে তার আশেপাশের লোকজনের প্রয়োজনের বিষয় নিয়ে। আপনাকে তরতাজা রাখার জন্য আপনার সহোদর যেন মারা না পড়ে সেদিকে আপনাকে সচেতন থাকতে হবে। মানবতা তো এটাই, গোটা বিশ্ব মাত্র একজন মানুষের ঔরষ থেকে হয়েছে জাত, যার ব্যাত্যয় খুঁজে পাবার নয়। খোদা তো মাত্র একজন। তিনি হলেন সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী, আবার তিনি নিজেই প্রেম, বলতে পারেন প্রেমের দরিয়া।
তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন স্বীয় প্রতিনিধি হিসেবে, কেননা তিনি হলেন এক বাতেনি রুহানি সত্ত¡া যাকে দর্শন করতে হলে কেবল বিশ্বাসের চোখ দিয়ে দেখতে হবে। ছোট্ট একটা দৃষ্টান্ত দেয়া চলে, প্রতিটি মুহুর্তে বেঁচে থাকার জন্য শরীরের প্রয়োজন অক্সিজেন যা বাতাসের সাথে মিশে থাকে। আপনি কি তা দেখতে পাচ্ছেন? প্রশ্নই জাগে না। তাই প্রশ্ন রাখি, আপনি দেখতে পাচ্ছেন না বলে বাতাস কি টেনে নিবেন না, তবে তো মৃত্যু আপনার জন্য হয়ে গেল অবধারিত। খোদাকে আপনি দেখতে পারছেন না বটে কিন্তু আপনার কল্যাণে তিনি যা কিছু সৃষ্টি করে রেখেছেন নির্বিবাদে বিনে আপত্তিতে, তা জন্মাবধি ব্যবহার করে চলছেন।
নিত্যদিনের কর্মকান্ডে আপনাকে শৃঙ্খলা বজায় রেখে চলতে হয়। অফিসে যাচ্ছেন, ব্যাংকে যাচ্ছেন, বাজারে যাচ্ছেন, প্রতিটি কর্মক্ষেত্রে আপনার আগে-পিছে ২/৪জন বা ততোধিক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে আছে, আপনাকেও শৃঙ্খলা বজায় রাখা ও কাজকর্মে গতি ও ধারাবাহিকতা ধরে রাখার জন্য নিয়ম শৃঙ্খলা অত্যাবশ্যক। আপনি গায়ের জোরে নিয়ম ভাংলেন, ফলে আপনি নিজেই বিপাকে পড়বেন, যা স্বতসিদ্ধভাবে প্রমানিত। উন্নত বিশ্ব অনেক খড়কুটো পুড়ে প্রকৃত শিক্ষা লাভ করেছে বহুলাংসে।
যা কিছুই নির্মাণ করি না কেন, চাই সেজন্য একটা মাষ্টার প্লান। তা অবকাঠামোগত ও এর সুফল কুফল উপকারিতা, অপকারিতা, কতলোক এর দ্বারা লাভবান হবে, আর কতলোক হবে এর ফলে ক্ষতিগ্রস্থ তা হিসেব-নিকেশ করে তবে কাজে হাত দিতে হবে। মাষ্টার প্লান অগ্রাহ্য অবহেলা করা চলবে না।
বর্তমান বিশ্ব কোন পথে চলছে তা আমাদের অবশ্যই ক্ষতিয়ে দেখতে হবে। যে কোনো কাজের পরীক্ষা-নিরীক্ষা মাঝে মাঝে করে চলতে হবে, তার কারণ হলো, মাষ্টার প্লান অনুযায়ী কাজের অগ্রগতি বজায় থাকছে কিনা। চলার পথে মাঝে মাঝে সিগনাল চিহ্ন দেখে নিতে হয়, বিশেষ করে নতুন পথে পা বাড়ালে। মানব জীবনটা তো প্রতিটি মুহুর্তে নতুন পথে চলতে হয়। যেদিন বা যে সময় অতিক্রান্ত হলো তা তো আর কোনো কালেই ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। আর অনাগত দিনগুলো যে কি বয়ে আনবে তাও আমাদের জানা নেই বা জানার প্রশ্নই জাগে না। তাই বর্তমান মুহুর্তটি যেন সম্পূর্ণ মাষ্টার প্লান অনুযায়ী চলে, সে দিকে অবশ্যই শতভাগ নজর দিতে হবে।
আসুন মানুষ নিয়ে আলোকপাত করা যাক!
খোদা নিজ সুরতে স্বীয় প্রতিনিধি হিসেবে মানুষ সৃষ্টি করলেন। মানুষের মর্যাদা যে কতোটা তা খোদার উক্তির মধ্য দিয়ে দেখে নেয়া যাক। খোদা বললেন, ‘আমরা আমাদের মত করে এবং আমাদের সঙ্গে মিল রেখে এখন মানুষ তৈরি করি’ (পয়দায়েশ ১ ঃ ২৬)।
উক্ত বর্ণনার আলোকে মানুষ হলো খোদার মত করে সৃষ্ট। গোটা বিশ্বে স্বর্ণ একই, হীরকখন্ড তাও অভিন্ন, জল-হাওয়া অপরিবর্তিত। মেঘ যখন আকাশে উড়ে চলে তখন ওগুলো একই থাকে, গোলমাল যা কিছু ঘটে তা হলো ভূমে পতনের পর। প্রথম নর-নারী আদম হাওয়া বিতাড়িত হবার পূর্বে কতদিন বেহেশতে বা এদন-কাননে বসবাস করছেন তা জানা নেই, তবে পতনের পূর্বে তারা ঐশি সুরতে মহিমান্বিত ছিলেন, যা নিঃসন্দেহে বলা চলে। তরতাজা ফুলফল পোকার আক্রমনের পূর্বপর্যন্ত হৃদয় কাড়া থাকে, আর পোকার আক্রমনের সাথে সাথে তা বিক্রিত রূপ ধারণ করে। পততেন পূর্বমুহুর্ত পর্যন্ত যে কোনো কাঁচের তৈজসপত্র থাকে প্লান মোতাবেক ব্যবহারোপযুগী। তবে কঠিন শিলার উপর পতন ও ভগ্নদশার পর উক্ত পাত্রের খন্ডিতাংশ দিয়ে মুল পাত্রের বর্ণনা দেয়া আদৌ সম্ভব নয়। চাই আর একটি নতুন পাত্র যা থাকবে সম্পূর্ণ অক্ষত নিখুঁত অবস্থায়, তবেই খন্ডিত দ্রব্যের পূর্বাবস্থা আমরা অবলোকন করত সক্ষম হবে।
বিশ্বের তাবৎ মানুষ স্বমহিমায় বহন করবে খোদার প্রতিচ্ছবি, যাদের দেখে বাতেনি বা বিমূর্ত রুহানি খোদার ঐশি গুনাবলি প্রত্যক্ষ করা সম্ভব হবে। যে কোনো জীবিত গাছ দিবালোকে কার্বনডাই অক্সাইড গ্রহণ করে ও অক্সিজেন করে নিঃসরণ ও পরিবেশন। প্রাকৃতিকভাবেই তেমন ব্যবস্থা নির্দিষ্ট করে রাখা হয়েছে।
বর্তমান বিশ্বের মানুষগুলো যেন ভেঙ্গে পড়া কাঁচের পাত্রের খন্ডিতাংশ যা দেখে বিমূর্ত খোদার সুকুমার গুনগুলো অনুধাবন করা সম্ভব হচ্ছে না। বরং মানুষের মধ্যে অদ্যাবধি বাধ-বিভেদ হত্যাযজ্ঞ চলে আসছে যা হলো কেবল ইবলিসের কর্মকান্ডই প্রকাশ করছে। খোদাশ্রিত না হয়ে মানুষ আজ পরিষ্কার ইবলাসাশ্রিত হয়ে আছে। চাই তাদের মুক্ত করা। চাই এমন এক মহান উদার ব্যক্তি যিনি ক্ষমতা রাখেন ইবলিসের মস্তক চূর্ণ-বিচূর্ণ করার। তা খোদা ছাড়া আর কে আছে বলুন! আদমের অবাধ্যতা ও ইবলিসের মন্ত্রে দীক্ষা গ্রহণের পর থেকে সে হারিয়ে ফেলেছে তেমন শক্তি, আর তাঁর ঔরষজাত প্রত্যেকটি ব্যাক্তি ডুবে আছে গাড় অমানিশায়। মানুষের কর্মকান্ড তেমন সাক্ষ্য বহন করে চলছে নিত্যদিন। পাককালামে তাই যথার্থ বর্ণনা রয়েছে, ‘সকলে পাপ করেছে আর খোদার গৌরব হারিয়ে বসেছে। মানুষের মধ্যে একজনও নেই যে কিনা শতভাগ পূতপবিত্র, নিখুঁত কোরবানির মেষ হবার যোগ্য। খোদার মহান পরিকল্পনা আজ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার জন্য চাই আর একজন মানুষ, যিনি থাকবেন একদিকে সম্পূর্ণ মানুষ ও সম্পূর্ণ রুহানি ব্যক্তিত্ব নিয়ে শতভাগ পূতপবিত্র, যেমন খোদা শতভাগ পূতপবিত্র। যেমন খোদা হলেন শতভাগ পূতপবিত্র যার মাধ্যমে আজ প্রত্যেকটি মানুষ ফিরে পেতে পারবে হারিয়ে যাওয়া ঐশি প্রাধিকার, আদর্শ ও রুহানি ক্ষমতা।
পাককালামে তেমন একটি বর্ণনা রয়েছে, যা হলো সত্যিকারার্থে যদি কেউ খোদাবন্দ হযরত ঈসা মসিহের মধ্যে ডুবে যায় তবে উক্ত ব্যক্তি সম্পূর্ণ এক নতুন মানুষে পরিণত হয়ে ওঠে, তার পুরাতন স্বভাব আচরণ সম্পূর্ণ বদলে গিয়ে সম্পূর্ণ খোদার চরিত্রে চরিত্রবান হয়ে ওঠে, আর এ দায়িত্বটুকু খোদা নিজের হাতেই পালন করে থাকেন। হযরত পৌল নিজেকে মসিহের হাতে তুলে দিয়ে তেমন পরিবর্তনের কথা প্রকাশ করেছেন, তিনি সম্পূর্ণ মৃত আর তার মধ্য দিয়ে মসিহ জীবিত হয়ে আছেন। মৃত ব্যক্তি কেমন করে কথা বলে? এ রহস্য হলো তিনি তার নিজস্ব মতবাদ অভিপ্রায় সম্পূর্ণ জলাঞ্জলি দিয়ে মসিহের শতভাগ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য সম্পূর্ণ আলাদাকৃত হয়েছিলেন।
কালামে বহুস্থানে তেমন শিক্ষা রয়েছে, কুপথ থেকে ফিরে আসা, মন্দ কর্মকান্ড পরিহার করা, ইবলিসের পদাঙ্ক অনুসরণ বন্ধ করা; খোদার রাজ্য ও তার ধার্মিকতা প্রধান্য দেয়া, মানুষের বিচার না করে কল্যাণ কর্মের মাধ্যমে খোদার পথে ফিরিয়ে আনা, এ কাজটি মসিহ নিজে করেছেন, তবেই আজ বিশ্বের একটা আমূল পরিবর্তন সাধন করা সম্ভব। মানুষ কেবল পাপের প্রভাবে আজ বহুধা বিভক্ত। মানুষের মধ্য থেকে পাপের বিষ চুষে বের করতে হবে অথবা মানুষকে বিষমুক্ত করতে হবে, আর তখনই সকল মানুষ নিজেদের মধ্যে সৃষ্ট ভেদাভেধ থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে। মাষ্টার প্লান অমান্য করে যারাই কিছু গড়তে চায়, তারা একসময় মহাবিপদে পতিত হয়। পরিশেষে বুলডোজার এসে তাদের নির্মাণ ভেঙ্গে ফেলে। খোদার মাষ্টার প্লান হলো, আমরা সকলে মানুষ, আর একদিন সকলকে এক কাতারে হাজির করা হবে। তেম ক্রান্তিলগ্নে আমাদের কোনো ওজর আপত্তি করা চলবে না।
সকলকে মানুষ বলে স্বীকৃতি দিতে হবে, সবার উপর মানুষ সত্য। মানুষ হলো খোদার যোগ্য প্রতিনিধি। আজ তারা শাপগ্রস্থ, চাই সকল প্রকার শাপ থেকে মুক্তি লাভ। আর সেই মুক্তি এনে দিলেন খোদার পুত্র খোদাবন্দ হযরত ঈসা মসিহ স্বীয় বেগুনাহ রক্তের মূল্যে। মানুষের জন্য মাত্র একটিই পথ খোলা আছে পুনরায় মানুষ হওয়ার অর্থাৎ খোদার পবিত্রতা ও মর্যাদা লাভ করে খোদার ক্রোড়ে সমাসিন হবার।
বিশ্বের তাবৎ মানুষের জন্য খোদাবন্দ হযরত ঈসা মসিহ নিজ প্রাণ কোরবানি দিলেন, উক্ত পাপার্থক কোরবানিতে বিশ্বাস স্থাপন করে প্রত্যেকে হয়ে গেল রূপান্তরিত মানুষ কালামের একটি আয়াত তুলে ধরা হলো; ‘সেজন্য এখন থেকে মানুষকে আমরা আর তার বাইরের অবস্থা দেখে বিচার করি না। অবশ্য মসিহকে আমরা আগে সেভাবেই বিচার করেছিলাম, কিন্তু এখন আর তা করি না। যদি কেউ মসিহের সঙ্গে যুক্ত হয়ে থাকে তবে সে নতুনভাবে সৃষ্ট হল। তার পুরানো সব কিছু মুছে গিয়ে সব নতুন হয়ে উঠেছে। এই সব আলাহ থেকেই হয়। তিনি মসিহের মধ্য দিয়ে তাঁর নিজের সঙ্গে আমাদের মিলিত করেছেন, আর তাঁর সঙ্গে অন্যদের মিলন করিয়ে দেবার দায়িত্ব আমাদের উপর দিয়েছেন। এর অর্থ হল, আলাহ মানুষের গুনাহ না ধরে মসিহের মধ্য দিয়ে নিজের সঙ্গে মানুষকে মিলিত করছিলেন, আর সেই মিলনের খবর জানাবার ভার তিনি আমাদের উপর দিয়েছেন। সেজন্যই আমরা মসিহের দূত হিসাবে তাঁর হয়ে কথা বলছি। আসলে আলাহ যেন নিজেই আমাদের মধ্য দিয়ে লোকদের কাচে এই মিনতি, তোমরা আলাহর সঙ্গে মিলিত হও। ঈসা মসিহের মধ্যে কোন গুনাহ ছিল না; কিন্তু আলাহ আমাদের গুনাহ তাঁর উপর তুলে দিয়ে তাঁকেই গুনাহের জায়গায় দাঁড় করালেন, যেন মসিহের সঙ্গে যুক্ত থাকবার দরুন আলাহর পবিত্রতা আমাদের পবিত্রতা হয়’ (২করিন্থীয় ৫: ১৬-২১)।