যিনি ধর্মের বিধিবিধান নিয়মিত পালন করে চলেন তাকে অবশ্যই লোকে সম্মান করে এবং তেমন ব্যক্তি সম্মান পাবার যোগ্য। সমাজে অবশ্য তেমন ব্যক্তির উপস্থিতি বিরল। যা কিছু দেখা যায় তা বকধার্মিক বা কপটধার্মিক এবং ধর্ম নিয়ে ব্যবসা বাণিজ্য করার লোক অগণিত। ধর্ম বলার সাথে সাথে মনে এমন এক মহান সত্তার কথা জাগে যিনি মানব কল্যাণে থাকেন সদাব্যস্ত। যিনি অনাদি অনন্ত, সর্বত্র বিরাজমান সর্বদর্শী সর্বশক্তিমান। গোটা বিশ্ব যিনি নির্মাণ করেছেন, দেখাশুনা করে চলছেন, যার নজর থেকে ক্ষুদে কোনো বস্তুও লুকানো থাকতে পারে না। এমন মহান প্রভুকে আজ আমরা চাই একান্ত আপন জন হিসেবে। ক্ষণভঙ্গুর এ বিশ্বে আমরা বড়ই ক্লান্ত, দিশেহারা। কথায় বলে, ‘আমি কেরামত, যেখানে লাগাই হাত সেখানে লাগে মেরামত।’ কথাটা রহস্যচ্ছলে বলা হলেও বাস্তবে বড়ই তাৎপর্যবহ। খোলা ময়দান যেমন চাষীদের হাতে রূপান্তরিত হয় বনবনানীতে আবার যুদ্ধের সময় এই মানুষের হাতেই তা হয়ে যায় বিরাণ। অবশ্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ দুর্ঘটনায় নগর জনপদ সমানে লন্ডভন্ড করে ছাড়ে। মানুষ আসলে সহায়–সম্বলহীন এক প্রাণী মাত্র। মানুষ পশুপাখী তথা তাবৎ প্রাণী জগৎ বেঁচে থাকে কেবল খোদার অশেষ রহমতে।
সকল মানুষ বেঁচে আছে একই অক্সিজেন টেনে। গত্যন্তর নেই! একই জল কাদা, যাবেন কোথা দাদা? চন্দ্র–সূর্য, গ্রহ–নক্ষত্র, জল–মাটি, তাও একই। আসলে সুদূর প্রসারী পরিকল্পনা নিয়ে মহাজ্ঞানি নির্মাতা গোটা বিশ্ব রচনা করেছেন যাতে প্রাণীকূল বিশেষ করে মানবজাতি হেথা সুখে–শান্তিতে বসবাস করতে পারে।
মানুষ পরষ্পর ভাই ভাই। একই আদম (আ.) থেকে জন্ম হয়েছে সকল মানুষের। বিষয়টি বড়ই রহস্যাবৃত। আর এ রহস্য উদ্ঘাটন করার জন্য বহুমতবাদের জন্ম নিয়েছে। চূড়ান্ত নিকাশ মেলে ধর্মীয় ব্যাখ্যা বিশ্লেষণে, অর্থাৎ ঐশি বিধিবিধান পর্যালোচনা করার ফলে। প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক, একই আদম–সূত হওয়া সত্ত্বেও মানুষের মধ্যে এতোটা গড়মিল কী করে জন্মালো? বাহ্যত প্রশ্নটি অবান্তর নয়। প্রাণীজগতের মধ্যে মানুষ অন্যতম। ক্ষুৎপিপাসা, প্রাকৃতিক ডাক, প্রজনন প্রক্রিয়া, মৃত্যু এবং মাটিতে মিশে একাকার হয়ে যাওয়া সবই অভিন্ন। তবে মানুষকে ধীমান বলা হয়, বলা হয় খোদার বা স্রষ্টার খাস প্রতিনিধি।
মহান স্রষ্টা মাত্র একজন, যিনি তাঁর মহাশক্তি দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করে চলছেন গোটা সৃষ্টি। মানুষ বাধ্য, মিলে মিশে বসবাস করতে। কামার–কুমার, জেলে–তাতী, মজুর–চাষি, যে যেকোন পেশায় নিয়োজিত থাক না কেন প্রত্যেকের প্রয়োজন প্রত্যেককে। প্রফেশনে ভিন্নতা যতোই থাক না কেন, প্রয়োজনের খাতিরে তারা পরষ্পরের মুখাপেক্ষী। এ বিষয়ে বিষদ ব্যাখ্যার প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না। সকলেই একই ছাদের তলে করছি বসবাস। মুরোদ নেই ভিন্ন ছাদ নির্মাণ করে ভিন্ন আলো বাতাস টেনে নিয়ে বসবাস করা। নিরুপায়! কোনো বিষয়ে যার থাকে বিশেষ জ্ঞান তাকে বৈজ্ঞানিক বলা হয়। সাধারণ লোক যা দেখে না বা বুঝতে পারে না তেমন বিষয় ওই বৈজ্ঞানিক ব্যক্তিটি দিবালোকের মতো পরিষ্কার দেখতে পান। বিশ্লেষণ করে তিনি যখন বিশেষ বিষয়টি জনসমক্ষে তুলে ধরেন, তখন সাধারণ জনতা একটু একটু করে এগিয়ে চলে এবং পরিশেষে উক্ত ধারণা ও তার সুফল লুফে নেয়। বিদ্যুতের কথাই ধরুন। গ্যালভনিকে তদানিন্তন সমাজ তো পাগল খেতাবে ভুষিত করেই ক্ষান্ত। আজ তিনি সম্মানের ব্যক্তি, সর্বজনে বরেণ্য বৈজ্ঞানিক। বিদ্যুৎ আবিষ্কার সভ্যতার বিকাশের ক্ষেত্রে বিশাল অবদান রেখেছে তা এক মুহুর্তে আঁচ করা সম্ভব নয়। বিদ্যুৎ ছাড়া গোটা বিশ্ব সম্পূর্ণ অচল। মিডিয়ার ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ, চিকিৎসার ক্ষেত্রে, চাষাবাদের প্রয়োজনে, রান্না–বান্নায় বিদ্যুৎ, বলুন, কোথায় না প্রয়োজন বিদ্যুতের, অথচ এর আবিষ্কারককে পাগল বলে তুচ্ছ করা হয়েছিল কোনো এক সময়। ভাগ্যিস, অসীম ধৈর্য্য নিয়ে তিনি তাঁর গবেষণা চালিয়ে গিয়েছিলেন, পথিমধ্যে হতোদ্দম হয়ে পড়েননি। একটা কিছু নতুন আবিষ্কার, তার অর্থ হলো সমাজদেহে গতিসঞ্চার। গবেষণার কাজ একদিকে হতাশাব্যাঞ্জক, অন্যদিকে নয় তা জনপ্রিয়। জনধিক্কার পাবার জন্য তাকে পদে পদে প্রস্তুত থাকতে হয়। বিচারকগণের যেমন থাকতে হয় নিরপেক্ষ দৃষ্টি ও মানসিকতা তদ্রুপ একজন গবেষক অবশ্যই নিরলস নির্লোভ থেকে তাঁর গবেষণা কর্ম চালিয়ে চলেন।
আমরা ফিরে আসি আজকের প্রসঙ্গে। আমাদের গবেষণার বিষয় হলো ‘ধর্ম’। পৃথিবীতে কোনো ধার্মিক লোক জন্মায়নি। সকলে আদম সন্তান। আদম (আ.) অবাধ্য হলেন, অভিশপ্ত ইবলিসের কুমন্ত্রে ধরা খেয়ে। খোদার হুকুমের পরিপন্থি কাজ করলেন, পরিশেষে হলেন বিতাড়িত পূতপবিত্র এদন কানন থেকে তথা হারিয়ে ফেললেন আল্লাহপাকের সাথে স্থাপিত আন্তরিক সহভাগিতা। তাদের তাড়িয়ে দেয়া হলো বর্তমানকার স্থানে, তাঁর সন্তান হিসেবে হেথা আপনি আমি বর্তমানে রয়েছি বসবাসরত।
একবিংশ শতাব্দিতে এসে আমরা ধর্ম নামের ভূইফোর ছত্রাকের মতো অগণিত ধর্ম দেখতে পাচ্ছি যার প্রবক্তাগণ ধর্মরক্ষার নামে মানুষ পর্যন্ত বলি দিতে পিছপা হচ্ছে না। এদের করজোড়ে ধার্মিক বলে কুরনিশ করতে হবে। অদৃষ্টের পরিহাস না অজ্ঞতার কুফল, কোনটি বলবো? মানুষ আজ অগণিত ভাগে বিভক্ত। বিভক্তিতে আপত্তি ছিল না, তবে তারা যেভাবে বিবদমান, অহিনকুল সম্পর্কে উপনীত, তাতে হৃদয় থাকে সদা শংঙ্কিত। ‘ধার্মিক’ শব্দটি তার মর্যাদা হারিয়ে বসেছে। ধর্ম আজ কেবল লেফাফা আলখেল্লার মধ্যেই খুঁজে নিতে হবে, অন্তরের বিষয় বলে এখন তা আর পালিত হচ্ছে না।
ধর্ম হলো হৃদয়ের ধন, কোনো মতেই পোশাক পরিচ্ছদ, খাদ্যদ্রব্য, বাড়িগাড়ি, দেশ–কাল–পাত্র ভেদে চিহ্নিত হবার নয়। ধর্মকে আমরা যোগসূত্র হিসেবে গণ্য করতে পারি এবং তা মানুষ ও মাবুদের মধ্যে। ধার্মিক মাবুদ মানুষের সাথে যুক্ত থাকতে চান এবং তিনি বান্দার হৃদয় সিংহাসন রাখতে চান সদা পূতপবিত্র। প্রসঙ্গক্রমে তিনি বলেছেন, তাঁর জন্য গৃহ নির্মাণ করা মানুষের পক্ষে অসম্ভব। তিনি নিজেই তা নির্মাণ করে জগতে ছেড়ে দিয়েছেন এবং ওই চলমান গৃহগুলো হলো মানুষ, যাকে তিনি নিজ হাতে নিজের পরিকল্পনা মোতাবেক নিজ প্রতিনিধি তথা নিজগৃহ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তাই মানুষই হলো আল্লাহপাকের আবাসভূমি, বসতবাটি। তা মাবুদ নিজে যেমন পূতপবিত্র তদ্রুপ তাঁর বসতবাড়িও পূতপবিত্র হতে হবে। কালামে তাই বর্ণীত আছে, ‘তোমাদের বেহেশতি পিতা যেমন খাঁটি তোমরাও তদ্রুপ খাঁটি হও’ (মথি ৫ : ৪৮)। এবার আমাদের গবেষণার পালা।
আল্লাহপাকের অপরূপ অনুপম সৃষ্টি অভিশপ্ত ইবলিসের কুটচালে ছারখার হয়ে পড়েছে, তা গুছিয়ে পরিপাটি করার যে ব্যবস্থা তা অবশ্যই তাঁরই তরফ থেকে শুরু ও কার্যকর হতে হবে। যেহেতু তিনি একমাত্র সর্বশক্তিমান সর্বদর্শী সর্বত্রবিরাজমান মাবুদ, তাই তাঁরই পক্ষে খুঁজে পাওয়া সম্ভব হারানো মানিকদের। এতোদুদ্দেশ্যে তিনি তাঁর জীবন্ত মহাপরাক্রান্ত কালাম এবং পাকরূহ মানবরূপে জগতে পাঠালেন যাতে করে তিনি তাঁর মহাশক্তি দিয়ে কালের শত্রু ইবলিসের মস্তক চূর্ন করে দিতে পারেন এবং মানুষের কৃত পাপের কাফ্ফারা নিজের পূতপবিত্র রক্তের মূল্যে পরিশোধ দিতে পারেন। তিনি হলেন অগতির গতি প্রেমের পরাকাষ্টা ঐশি মেষ খোদাবন্দ হযরত ঈসা কালেমাতুল্লাহ। তিনি জগতে যতোটা সময় বিচরণ করেছেন, মানুষকে সত্যপথের বিষয়ে শিক্ষা দিয়েছেন, চেতনা দিয়েছেন, নিজের পূতপবিত্রতা রক্ষা করেই তা করেছেন। প্রশ্ন জাগতে পারে, আদম থেকে জাত সকলে পাপের পংকে ডুবন্ত, অথচ তিনি কী করে মানব সমাজের মধ্যে বেগুনাহ জীবন যাপন করলেন, কী করে তার পক্ষে সম্ভব হলো নিষ্কলুশ জীবন ধরে রাখা? জবাব অতীব পরিষ্কার! তিনি যে জীবন্ত আল্লাহপাকের রূহ। যে অভিশপ্ত ইবলিস সকলকে ধোকা দিয়েছে সেই কালনেমী মসিহকেও যে ধোকা দিতে প্রচেষ্টা নেয় নি তা কিন্তু নয়, মসিহকেও ওই ইবলিস ধোকা দিতে চেষ্টা করেছিল, কিন্তু মহিসের ধমকে ওই ইবলিস বোকা বনে গিয়েছিলো, হয়েছিল বিতাড়িত।
আপনি মসিহ থেকে দূরে রয়েছেন তো কর্ম সাবার। আর মসিহের মধ্যে জীবন যাপন করবেন, দেখবেন আপনার ধমনিতে বহমান হচ্ছে অমীত শক্তি, পূতপবিত্র শক্তি, গঠন মূলক ধ্যান–ধারণা, গোটা বিশ্বের কল্যাণবাহি প্রেরণা পেশনা। পাকরূহই তা নিয়ত সৃষ্টি করে চলছে। আপনি হলেন জীবন্ত রাজার জীবন্ত দরবার। পবিত্র আত্মার বসতবাটি। অসহায় মানুষদের প্রতি আপনি রয়েছেন সতত মমতাপুষ্ট। মানুষে মানুষে সৃষ্ট বিভাজনকারী সর্বপ্রকার দেয়াল, তা কংক্রীটের হোক বা মনস্তাত্বিক হোক, ওগুলো আপনাকে সদা জ্বালাতন করছে, ওগুলো চূর্ন ও ধ্বংস না করা পর্যন্ত আপনার যেনো স্বস্তি নেই। সদা ফন্দি–ফিকির, প্লান–পরিকল্পনা, মানুষের কাছে যুক্তি পরামর্শ উপস্থাপন করা, যাতে তারা মানুষের মাঝে সৃষ্ট বেআইনি ক্ষতিকারক বিভাজনকারী দেয়ালের কুফল উপলব্দি করতে পারে, ঐকশক্তি নিয়ে হামলে পড়তে পারে অভিশপ্ত ইবলিসের সৃষ্ট মানবতা বিরোধি সর্বপ্রকার ডিভাইডিং ওয়াল, যেমন বার্লিন ওয়াল জনরোশে হয়েছিল কুপোকাত। আজ আমাদের সচেতন হবার পালা। কোনো বিষয়ের তথ্য উপাত্ত পূর্ণাঙ্গরূপে জানা না থাকলে ওই বিষয়ের ওপর কোনো রায় বা মন্তব্য করা সম্ভব নয়। আজ আমাদের জানতে হবে মানুষের প্রকৃত পরিচয়। কে এই মানুষ? কে তাদের করেছেন সৃষ্টি? কার সুরতে এবং কী উদ্দেশ্যে? মানুষকে বলা হয়েছে সৃষ্টির শ্রেষ্ট জীব আল্লাহপাকের খাস প্রতিনিধি। তা প্রতিনিধি সার্বিক দিক দিয়ে রূপেগুনে তাঁরই হুবহু প্রকাশ হতে হবে। বৃক্ষকান্ড ও বৃক্ষ শাখা কি কখনো ভিন্ন ভিন্ন ফুল ফল প্রকাশ করে? অসম্ভব। তাদের সবকিছু থাকে অভিন্ন!
খোদাবন্দ হযরত ঈসা মসিহ তাঁর নিবেদিত সাহাবীদের ঘোষণা দিয়েছেন বৃক্ষ–শাখা রূপে। তিনি যেমন পূতপবিত্র, শাখা প্রশাখাগুলো তদ্রুপ পূতপবিত্র থাকবে, এটাই স্বাভাবিক প্রত্যাশা। মসিহ নিজেকে দুনিয়ার নূর হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন এবং তাঁর ভক্ত সাহাবিদের তিনি দুনিয়ার নূরে করেছেন পরিণত। তিনি আর্তপীড়িত দুস্থ মানুষের সেবা করেছেন এবং একই মনোভাব ও সেবা আজ তাঁর সাহাবিদের কাছ থেকে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। তিনি হারিয়ে যাওয়া ও বিবদমান বিশৃঙ্খল মানুষগুলোকে এক কাতারে একই প্লাটফর্মে অর্থাৎ মহান পিতার ক্রোড়ে ফিরিয়ে নিতে এসেছেন, বিপন্ন বিশ্ব আজ তার সাহাবিদের কাছ থেকে ঐ একই আচরণ প্রত্যাশা করে।
ধর্ম নিয়ে গবেষণা কোনো বৈশয়িক কর্মকা– হতে পারে না। অধার্মিক ব্যক্তিদের সত্যসুন্দরের পথে ফিরিয়ে আনা হলো এক আদর্শস্থানীয় কাজ, ঐশি পয়গাম প্রকাশ করা, এবং যারা তেমন কাজে থাকে নিবেদিত তাদেরকে অবশ্যই পয়গামবাহী বা পয়গাম্বর বলা হবে। যেমন বার্তা প্রচারকারীকে বার্তাবাহক বলা হলে কারো কোনো ওজর আপত্তি ওঠেনা, অথচ ভাষান্তরে গেলে মানুষ বেঁকে বসে। এটাও এক ধরনের অজ্ঞতা। একদা করাচি থাকা কালীন যাত্রাপথে কোনো এক ব্যক্তিকে বলেছিলাম, ‘হযরত যারাছা ব্যঠনে দিজিয়ে’ অর্থাৎ জনাব, একটু বসতে দিন, সাথে সাথে তিনি নিজেকে সঙ্কুচিত করে আমার বসার জন্য স্থান করে দিলেন। বাংলাদেশে ‘হযরত’ শব্দটি বলা হলে মনে হবে বেহেশতি কোনো শব্দ। অথচ সকল ভাষা তা হোক না যতোই খাসা, সবগুলোই হয়েছে মানুষের হাতে রচিত।
মানুষ নিজের প্রয়োজনে নিজেদের সাথে যোগাযোগ লেনদেন করার কারণে এক ধরনের সাংকেতিক শব্দ ও ‘আঁকিঝুকি’ আবিস্কার করেছে এবং কালের প্রয়োজনে ও নিরন্তর গবেষণার ফলে ওই আঁকিঝুকি বর্তমানকার আধুনিকরূপ লাভ করে আমাদের চলার পথ কথঞ্চিৎ মশৃণ করেছে। তাই বলে শব্দ চিরদিন শব্দই থেকে যাবে, শব্দ কখনো বস্তুতে পরিণত হবে না, আর আমাদের ক্ষুৎপিপাসা নিবারণ করার ক্ষমতা পাবে না।
শব্দ অর্থাৎ ধ্বনি ও লেখা বা পাঠ্য বিষয় কেবল মানুষকে সচেতন করে তুলে যাতে তারা বাস্তবের মুখোমুখি হতে পারে। ‘জল’ শব্দ তৃষ্ণা মেটায় না তবে তৃষ্ণার্ত ব্যক্তিকে প্রকৃত জলের কাছে যেতে বা জল দ্রব্যটি পেতে সাহায্য করে। একইভাবে, ধর্মের বাণী ধর্ম নয়, তা যতোই সুরেলা গলায় করা হোক উচ্চারণ। উচ্চারণের প্রতিযোগীতা চলে প্রতি বৎসর, কিন্তু এ প্রতিযোগীতার প্রভাব সমাজে যে কতোটা পড়ে তা বিবেচ্য বিষয়। আবার মুখস্ত করার ফলই বা কতটা রয়েছে তাও আমাদের বুঝতে হবে। পাককালাম নোংরা ব্যক্তিকে পূতপবিত্র হতে সাহায্য করে। তার অর্থ হলো, যিনি পূতপবিত্র বেগুনাহ ব্যক্তি তিনিই মানুষকে পূতপবিত্র করার জন্য নিজের জীবন করেছেন দান। কেবল তাঁর সাথে যুক্ত হবার ফলে গুনাহগার ব্যক্তি হতে পারে সম্পূর্ণ বেগুনাহ।
গোটা বিশ্বের নির্মাতা রক্ষাকর্তা যেমনমাত্র একজনই রয়েছেন, পতিত বিশ্বটাকে স্নাতশুভ্র পূতপবিত্র করার মহানায়ক সর্বত্যাগী প্রেমের পরাকাষ্টা তেমন একজনই রয়েছেন। তিনি হলেন ঐশি মেষ আল্লাহপাকের একক ও পূর্ণাঙ্গ বহিপ্রকাশ খোদাবন্দ হযরত ঈসা মসিহ।
আজ মসিহের সাথে যতোজন যুক্ত তারা হতে পেরেছেন সম্পূর্ণ এক নবসৃষ্টি আর তাদের এ পরিবর্তন কেবল খোদার হাতেই হয়েছে সাধিত।
মসিহিগণ কোনো বৈষয়িক কাজের বিনিময়ে মসিহের প্রচার করেন না, যেমন একটি প্রষ্ফুটিত পুষ্প কোনো শর্তের বিনিময়ে সুঘ্রান বিতরণ করে না। পুষ্পের সুঘ্রান ছড়িয়ে দেয়া পুষ্পের স্বভাবজাত দায়িত্ব, যেমন সূর্য ও কিরণ এক কথায় সৌরকিরণ বিতরণ করা সূর্যের জীবন ও অস্তিত্ব। মসিহ হলেন দুনিয়ার নূর। তিনি পতিত ধরায় আবির্ভূত হয়েছে আপনাকে আমাকে পিতৃগৃহে ফিরিয়ে নেবার জন্য, মৃতকল্প দেহে জীবন দানের জন্য, হারিয়ে যাওয়া অধিকার ফিরিয়ে দেবার জন্য। কথায় বলে, আবার তোরা মানুষ হও। কবি গেয়েছেন একটি চেতনাদৃপ্ত গান, ‘মানুষের মাঝে টানে অবেধ সীমানা, পশুর কাতারে তাদের করিবে যোজনা, রচিয়া মাটির মানুষ দিলেন প্রেরণা, খোদার নায়েব ভূমে অমোঘ ঘোষণা।’ সমগ্র বিশ্ববাসির জন্য মাত্র একটিই আস্তানা, একটিই প্লাটফর্ম, আর তা হলো মহান রাব্বুল ইজ্জত আল্লাহপাকের কোমল হৃদয়, মসিহ এসেছে আমাদের ফিরিয়ে নিতে, স্থান করে দিতে ওই কাঙ্খিত স্থানে। কেবল ঈমানে আপনি পেয়ে গেছেন এ অভাবিত মুক্তি বা নাজাত, যা পতিত মানবের কলুষিত কর্মের দ্বারা অর্জিত হবার নয়। ধার্মিক কেবল ঈমান হেতু রক্ষা পায়।

