১ সেপ্টেম্বর বনজীবী ও পর্যটকদের জন্য খুলে দেওয়া হচ্ছে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবন। বনের জীববৈচিত্র্য ও প্রাণীকুলের প্রজনন মৌসুম ঘিরে দেওয়া এই নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ায় আবারও বনের নদী–খালে মৎস্যসম্পদ আহরণের সুযোগ পাচ্ছেন জেলেরা। কাঠ, মধু, গোলপাতা আহরণ করবেন বাওয়ালিরা। পর্যটন কেন্দ্রে ভ্রমণের সুযোগ পাচ্ছেন পর্যটকরা। সোমবার মধ্যরাত থেকে বন বিভাগের অনুমতি নিয়ে বনে প্রবেশ করতে শুরু করেছেন খুলনা ও বরিশাল উপকূলীয় অঞ্চলের লাখো জেলে ও হাজারো দেশি–বিদেশি পর্যটক। এদিকে বনের নদ–নদী ও খালে মাছ ও কাঁকড়া আহরণকারী উপকূলীয় জেলে এবং বাওয়ালিদের মাঝে গভীর শঙ্কাও বিরাজ করছে। বনদস্যুদের ভয়ংকর নির্যাতন ও তাদের ধার্যকৃত টাকা নিয়ে এই শঙ্কা। এসব মাথায় নিয়েই তারা প্রবেশ করবেন গহিন সুন্দরবনে জীবিকার সন্ধানে। জানা গেছে, প্রজনন মৌসুমে মাছ ও বন্যপ্রাণীর নির্ভয় বিচরণ নিশ্চিত করতে গত ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সব ধরনের প্রবেশাধিকার বন্ধ রেখেছিল বন বিভাগ। নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার পর সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকার জেলেদের মাঝে দেখা গেছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। ভাঙা নৌকা মেরামত, জাল সেলাই আর দড়ি বাঁধার কাজে দিনরাত ব্যস্ত তারা।
কয়রার উত্তর বেদকাশি গ্রামের প্রবীণ জেলে মোজাফফর বলেন, প্রায় ৪২ বছর ধরে জল–জঙ্গল করে কোনোরকমে বেঁচে আছি। বন বন্ধ হলে আমাদের উপার্জনের আর কোনো পথ থাকে না। তিন মাস চাল–ডালের টান ছিল, পর্যাপ্ত কোনো সহায়তা পাইনি। তবে ১ সেপ্টেম্বর বন খুললে আবার নামতে হবে। বনযাত্রার এই আয়োজনের পেছনে রয়েছে বিশাল ঋণের বোঝা। স্থানীয় জেলে ও বনজীবীরা জানান, চাল–ডাল কেনা, ট্রলার বা নৌকার তেল, ইঞ্জিন মেরামত, বন ও জলদস্যুদের কথিত চাঁদা, নতুন জাল ও পারমিটের আনুষঙ্গিক খরচ মিলিয়ে বনে নামার আগেই নৌকাপ্রতি ২০–২৫ হাজার টাকা থেকে লাখ টাকা পর্যন্ত আগাম খরচ হয়ে যায়। আর এই টাকার বেশির ভাগই আসে চড়া সুদের মহাজনি ঋণ থেকে।
কয়রার মৎস্য ব্যবসায়ী মো. কামরুল ইসলাম বলেন, উপকূলের বনজীবীদের এই যাত্রাকে কেবল সাধারণ কর্মসংস্থান বলা চলে না; এটি এক প্রকার জীবনের বাজি ধরা। একদিকে বনে পর্যাপ্ত মাছ পাওয়ার অনিশ্চয়তা, অন্যদিকে পদে পদে মৃত্যুঝুঁকি। সুন্দরবনের নদী–খালে পা ফেলতেই ওত পেতে থাকে হিংস্র বাঘ। একটু অসাবধান হলেই কিংবা ম্যানগ্রোভের গহিনে কাঠ ও গোলপাতা কাটতে গেলে কার কপালে বাঘের থাবা জোটে–সেই আতঙ্কে প্রতিটি মুহূর্ত কাটান বাওয়ালিরা। জলে নামলে রয়েছে নরখাদক কুমিরের ভয় আর ডালে ডালে সাপের ফোঁসফোঁসানি। কিন্তু প্রকৃতির এই হিংস্রতার চেয়েও এখন বেশি আতঙ্ক ছড়াচ্ছে সুন্দরবনে পুনরায় বনদস্যু বা জলদস্যুদের মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার আশঙ্কা। দীর্ঘ তিন মাস বন নীরব থাকায় গহিন জঙ্গলে নতুন করে দস্যু দলগুলোর ঘাঁটি গাড়ার খবর চাউর হয়েছে এলাকাজুড়ে। বনে ঢুকলেই অপহরণ, মুক্তিপণ দাবি এবং প্রাণনাশের হুমকিতে নিঃস্ব হতে হয় সাধারণ জেলেদের। বনজীবীদের দাবি, একদিকে বিষ দিয়ে মাছ ধরা বন্ধ ও নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার রুখতে যেমন বন বিভাগের কঠোর নজরদারি প্রয়োজন, তেমনি ডাঙার ডাকাত ও বনের জলদস্যুদের তাণ্ডব থামাতে কোস্ট গার্ডসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত টহল অপরিহার্য। সুন্দরবন পশ্চিম বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) এ জেড এম হাছানুর রহমান বলেন, ইতোমধ্যে জেলেদের পারমিট দেওয়ার জন্য সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে।
তারা যাতে নির্বিঘ্নে মাছ ও কাঁকড়া ধরতে পারেন তার জন্য সর্বাত্মক নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। মোংলা পৌর শহরের বাসিন্দা ও ট্যুরিজম ব্যবসায়ী মো. এমাদুল হাওলাদার বলেন, অনেকদিন পর পর্যটকদের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে সুন্দরবনের পূর্ব ও পশ্চিম বিভাগের ১১টি পর্যটনকেন্দ্র। দেশি–বিদেশি পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় পূর্ব বনাঞ্চলের কটকা, কচিখালী, হিরনপয়েন্ট, দুবলার চর, ডিমের চরসহ আশপাশের দর্শনীয় এলাকা। এসব পর্যটন স্পটে ভ্রমণের জন্য তিন দিনের প্যাকেজ ট্যুর করে থাকেন তারা। বনবিভাগের নির্দেশনা মেনেই তারা মৌসুমের শুরুতে সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছেন। খুলনা ও মোংলার প্রায় ৭০টি বিলাসবহুল যাত্রীবাহী লঞ্চ সুন্দরবনকেন্দ্রিক পর্যটক পরিবহণ করে থাকে। এছাড়া মোংলা, দাকোপ ও শরণখোলাসহ বনসংলগ্ন এলাকায় ৭ শতাধিক ছোট–বড় ট্যুর বোট রয়েছে। ইতোমধ্যে অধিকাংশ লঞ্চ ও ট্যুর বোট বুকিং হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।
সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের করমজল বন্যপ্রাণী প্রজনন কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হাওলাদার আবুল কালাম আজাদ জানান, চলতি বছরের পর্যটন মৌসুম ১ সেপ্টেম্বর হতে শুরু হয়ে একটানা আগামী জুন পর্যন্ত চলবে। পর্যটকদের আগমন ঘিরে পর্যটন স্পটসমূহে নানা প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। তার ধারণা, এই মৌসুমে দেশি–বিদেশি মিলে পুরো সুন্দরবনে প্রায় তিন লাখ পর্যটকের সমাগম ঘটবে। সাতক্ষীরা রেঞ্জের বুড়িগোয়ালিনী স্টেশন কর্মকর্তা (এসও) এরফান উদ্দীন বলেন, সুন্দরবনে দস্যু তৎপরতা ঠেকাতে নিয়মিত টহল ও নজরদারি রয়েছে। বন খোলার পর বনজীবীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


